‘কোরবানি’ বিতর্কে সমাজ-সংস্কৃতি ও সাহিত্য

 

ঈদুল আজহা বা কোরবানি ঈদ মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। সেমীয় আদি পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মহান আত্মত্যাগ ও ঐশী আনুগত্যের স্মৃতিবিজড়িত এই উৎসবটি মূলত আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তবে বঙ্গীয় অববাহিকায় (বিশেষ করে বাংলায়) এই উৎসব-উদ্‌যাপন কেবল ধর্মীয় রীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিগত দু শ বছরের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলায় কোরবানি ঈদ উদ্‌যাপন, গবাদিপশু কোরবানি এবং মাংস খাওয়ার অভ্যাসের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক বিবর্তনের ইতিহাস। উনিশ শতকের সামন্ততান্ত্রিক ও সামাজিক টানাপড়েন থেকে শুরু করে একুশ শতকের আধুনিক যন্ত্রসভ্যতা ও নাগরিক জীবনের দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে কোরবানি ঈদ নিয়ে নানামুখী আলোচনা, বিতর্ক ও চিন্তার প্রবাহ ঘটে চলছে।

উনিশ শতকে বা তার আগে বাংলায় কোরবানি ঈদ আজ আমরা যেভাবে সর্বজনীন ও উৎসবমুখর রূপে দেখি, তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে ঈদের উৎসবমুখরতা ছিল বিশেষ শ্রেণি ও গোষ্ঠীতে আবদ্ধ। ঐতিহাসিক দলিল ও চিত্রকর্ম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেই সময়ের ঈদ আনন্দ মিছিলে সর্বসাধারণের অংশগ্রহণ ছিল, তবে তা আজকের মতো ‘সমানাধিকার’ বা ‘নাগরিক অংশীদারিত্ব’ হিসেবে ছিল না, বরং ছিল ‘দর্শক’ কিংবা ‘অনুষঙ্গ’ হিসেবে। উনিশ শতকের শুরুর দিকে ঈদের মূল আনুষ্ঠানিকতা ও শাহি খাবারের আয়োজন সীমাবদ্ধ ছিল মূলত সুবেদার, নায়েবে নাজিম, নবাব এবং উচ্চপদস্থ মোঘল কর্মকর্তাদের মধ্যে। চিত্রশিল্পী আলম মুসাওয়ার ঢাকার ঈদ মিছিলের ছবি এঁকেছিলেন। তাঁর আঁকা চিত্র থেকে স্পষ্ট যে, সে-সময় ঈদের রাজকীয় জাঁকজমক সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। এমনকি আজকের জাতীয় ঈদগাহের মতো বড় প্রাঙ্গণগুলোতে কেবল সুবেদার, নায়েবে নাজিম এবং তাঁদের আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবরাই যাওয়ার অনুমতি পেতেন; সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার সেখানে সহজ ছিল না। ফলে নিম্নবিত্ত মুসলমানরা সাধারণত স্থানীয় ছোট কোনো মাঠে বা মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করে ঘরে ফিরতেন। 

অভিজাতদের প্রাসাদে প্রবেশাধিকার বঞ্চিত সাধারণ নিম্নবিত্ত মুসলমান ঈদের দিনটিতে বিনোদনের খোঁজ করতেন তাদের নিজস্ব এরিয়ার মধ্যে। যেমন বাদশাহী বাজারে (বর্তমান চকবাজার) কিংবা রমনার ঈদমেলায় যাওয়ার চল ছিল। তারা এসব স্থানে ভিড় জমাতেন, মাটির বা বাঁশের তৈরি সস্তা খেলনা কিনতেন এবং ময়দা ও ছানার তৈরি সাধারণ মিষ্টিজাতীয় খাবার খেতেন। ১৭শ-১৮শ শতকের ঐতিহাসিক গোলাম হোসায়ন সলীম তাঁর ‘রিয়াজ-উস সালাতিন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, বাংলার উঁচু-নিচু সব মানুষই মাছ, ভাত, সরষের তেল, দই আর মরিচ পছন্দ করত; ঘিয়ে রাঁধা খাসি বা মোরগের মাংস তাদের সাধারণ খাদ্যাভ্যাসের অংশ ছিল না। উনিশ শতকেও এর খুব একটা ব্যতিক্রম হয়নি। নিম্নবিত্তদের ঈদের দিনের খাবার মোটেও রাজকীয় হতো না। মাংস বা পোলাও-বিরিয়ানির মতো বিলাসী খাবার তাঁদের পাতে জুটত না বললেই চলে। কদাচিৎ কোনো কোনো এলাকায় বড়ো জমিদার বা নবাবদের দেওয়া কোরবানি থেকে উদ্বৃত্ত মাংসের সামান্য অংশ কিংবা দান-খয়রাত হিসেবে পাওয়া মাংসের মাধ্যমেই গ্রামীণ দরিদ্র মানুষ কোরবানির মাংসের স্বাদ পেতেন।

বাঙালি মুসলমানের সমাজ-সংস্কৃতি ও মাংস খাওয়ার এই যে বর্তমান মেলবন্ধন, তা এক দিনে গড়ে ওঠেনি। আদি বঙ্গদেশে বসবাসকারী মোঘল কর্মচারীরা বাঙালিদের চিরাচরিত ‘মাছ-ভাত’ খাওয়ার অভ্যাসকে ভিন্ন চোখে দেখতেন। এমনকি বারো ভূঁইয়ার প্রধান ঈসা খাঁ ও তাঁর পুত্র মুসাকেও তাঁরা ‘জেলে’ বলে উপহাস করতে ছাড়েননি। তাহলে এই মাছ-ভাত প্রিয় বাঙালি কীভাবে মোঘলাই মাংসের খানা মনেপ্রাণে গ্রহণ করল, তা এক বিস্ময়কর সামাজিক রূপান্তর। হয়ত এর পেছনে বড়ো ভূমিকা পালন করেছে উনিশ শতকের রেস্তোরাঁ সংস্কৃতি। ইংরেজরা আসার পর বাঙালি সমাজে, বিশেষ করে কলকাতায় রেস্তোরাঁ সংস্কৃতি চালু হয়। দেখা যায়, অপেক্ষাকৃত তরুণ সমাজ রেস্তোরাঁয় খাবার উপভোগ করতে পছন্দ করত। 

কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের পিতা রাজনারায়ণ দত্তের লেখায় এর প্রমাণ মেলে। এটি উনিশ শতকের চল্লিশের দশকের দিকের ঘটনা। কবি মধুসূদন দত্ত নিজে সুস্বাদু মাংস, পেটিস ও বিস্কুটের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন। গোড়ার দিকে কলকাতার ওইসব রেস্তোরাঁয় সাধারণত ইংরেজ বাবুর্চিরা রান্না করতেন। পরবর্তীকালে, মুসলমান বাবুর্চিরা এ পেশায় জনপ্রিয় হন। উত্তর ভারতের অপরিচিত প্রণালির রান্নাগুলো সাধারণত বাড়ির অন্দরমহলে নয়, রেস্তোরাঁতেই পাওয়া যেত। আঠারো ও উনিশ শতকের কিছু সময়ব্যাপী কাবাব, কোর্মা, পোলাও, বিরিয়ানির মতো মোঘলাই খাবার ওই সুবেদার, নবাব, আমির-ওমরাহদের মধ্যেই সীমায়িত ছিল। এরপর কলকাতায় রেস্তোরাঁ চালু হলে তা ক্রমশ সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। অবশেষে, বিশ শতকে এসে এই খাবার মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে অত্যধিক জনপ্রিয় ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে

উনিশ শতকে এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলায় কোরবানি ঈদ সর্বসাধারণের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে না পড়ার পেছনে অর্থনৈতিক কারণের পাশাপাশি সক্রিয় ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩) পর বাংলায় বিকশিত নতুন জমিদার শ্রেণির সিংহভাগই ছিলেন হিন্দুধর্মের। অন্যদিকে, পূর্ব ও মধ্য বাংলার বিশাল প্রজাসাধারণ ছিলেন মুসলিম কৃষক। ফলে কোরবানিকে কেন্দ্র করে তীব্র শ্রেণিদ্বন্দ্ব ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়। বহু জমিদার তাঁদের শাসিত এলাকায় মুসলিম প্রজাদের প্রকাশ্যে গরু কোরবানি দেওয়া নিষিদ্ধ করেন। জমিদাররা এটিকে তাঁদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং প্রজাদের অবাধ্যতা হিসেবে দেখতেন। কোনো মুসলিম কৃষক প্রকাশ্যে গরু কোরবানি দিলে জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনী তাদের ওপর চড়াও হতো। চড়া জরিমানাসহ তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা শাস্তির ব্যবস্থা করতেন। অনেক সময় জমিদাররা ব্রিটিশ প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নির্দিষ্ট এলাকায় পশু জবাইয়ের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করাতেন। সাধারণ কৃষকদের পক্ষে এই আইনি লড়াই বা জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অসম্ভব ছিল। ফলে নিম্নবিত্ত মুসলমানরা কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক সংকটের মুখোমুখি হতেন।

এই সামাজিক উত্তেজনার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন লক্ষ করা যায় তৎকালীন বাংলা সাহিত্য ও সাময়িকীর পাতায়। মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিকরা এই দ্বন্দ্বে দুটি স্পষ্ট ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েন। ১৮৮৯ সালে বাঙালি মুসলিম সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ মীর মশাররফ হোসেন তাঁর ‘গো-জীবন’ নামক একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। যদিও মীর মশাররফের অবস্থান ছিল কৌশলগত ও সম্প্রীতিমূলক, কিন্তু তীব্র ভুল বোঝাবুঝিতে সেটি তিক্ততার দিকে গড়ায়। তিনি লক্ষ করেন যে, গরু কোরবানি নিয়ে হিন্দু-মুসলমানের সামাজিক দূরত্ব ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাড়ছে। এর চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে দরিদ্র মুসলিম কৃষকদেরকে। তাই তিনি মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন গরুর পরিবর্তে ছাগল বা দুম্বা কোরবানি দেন। তাঁর যুক্তি হচ্ছে, ইসলামে কোরবানি দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও ‘গরুই কোরবানি দিতে হবে’—এমন কোনো কথা নেই। তাছাড়া, কৃষিপ্রধান বাংলায় বলদ বা গাভি রক্ষা করা হিন্দু-মুসলিম উভয়ের অর্থনৈতিক স্বার্থের অনুকূল। 

তবে মীর মশাররফের এই অবস্থানকে তৎকালীন রক্ষণশীল মুসলিম সমাজ (বিশেষ করে ‘আখবারে ইসলামীয়া’ ও 'সুধাকর' পত্রিকা গোষ্ঠী) ‘ইসলাম-বিরোধী’ এবং ‘হিন্দুতোষণ’ নীতি হিসেবে আখ্যায়িত করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে তীব্র সামাজিক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। পণ্ডিত রেয়াজুদ্দীন আহমদ মাশহাদী জবাবে ‘অগ্নিকুক্কুট’ নামক এক পুস্তিকা লিখে তীব্র সমালোচনা করেন এবং কোরবানিকে মুসলমানদের ধর্মীয় ও আইনগত অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দাবি জানান। অন্যদিকে, কবি মোজাম্মেল হক তাঁর শান্ত ও যুক্তিপূর্ণ লেখনীতে মীর মশাররফের মতকে সমর্থন করে প্রতিবেশীর অন্তরে কষ্ট না দেওয়ার আহ্বান জানান। মহাকবি কায়কোবাদও তাঁর কাব্যে হিন্দু-মুসলিম মিলনের গান গেয়েছেন এবং প্রকাশ্যে কোরবানি না দিয়ে, গোপনে সম্পাদনের পক্ষে মত দেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সাম্প্রদায়িক উসকানির ফাঁদে পা না-দেওয়া। 

মীর মশাররফের প্রায় তিন দশক পর, কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিখ্যাত ‘কোরবানী’ কবিতাটি লেখেন। ততদিনে বাংলায় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট অনেকটাই বদলে গেছে। খেলাফত আন্দোলন, ফরায়েজি আন্দোলনের প্রভাব এবং মুসলিম মধ্যবিত্তের বিকাশের ফলে মুসলমানরা নিজেদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে তখন সোচ্চার। নজরুল এই কবিতায় চেনা আচারের খোলস ভেঙে এক অভূতপূর্ব সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটালেন: 

"ওরে / হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদ্‌বোধন! / দুর্ব্বল ভীরু চুপ রহো, ওহো খাম্‌খা ক্ষুব্ধ মন!" 

 নজরুল কোরবানিকে কেবল একটি পশু জবাইয়ের আচার হিসেবে দেখলেন না। একে অন্যায়, দাসত্ব এবং ভীরুতার বিরুদ্ধে আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে দেখলেন। তিনি কোরবানিকে মহাত্মা গান্ধীর আন্দোলনের ‘সত্যাগ্রহ’ বা সত্যের সংগ্রামের সাথে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, কোরবানি মানে নিজের ভেতরের পশুত্ব, ভয় ও কাপুরুষতাকে বিসর্জন দেওয়া। ঔপনিবেশিক মুক্তির লক্ষ্য হিসেবে তিনি ইব্রাহিম (আ.)-এর ঐতিহাসিক ত্যাগ এবং পুত্রবলির স্মৃতিকে রূপক করলেন। তিনি অবদমিত যুবসমাজকে বোঝালেন, হাত পেতে কখনো ‘আজাদী’ মেলে না; ব্রিটিশদের তৈরি করা অন্যায়ের জেলখানা ভাঙতে জান-মালের কোরবানি ও শক্তির প্রয়োজন। নজরুলের এই কবিতা তৎকালীন মুসলিম সমাজকে সামন্ত-প্রভুভীতির দেয়াল ভেঙে আত্মমর্যাদায় খাড়া হতে প্রেরণা জুগিয়েছিল।

বিশ শতকের প্রথমার্ধে কোরবানিকে কেন্দ্র করে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে চলে বিচিত্র আদর্শিক আলোচনা। ‘মাসিক মোহাম্মদী’ (সম্পা. মোহাম্মদ আকরম খাঁ) গো-কোরবানির পক্ষে জোরালো ধর্মীয় ও আইনি যুক্তি দিয়ে একে মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে। অন্যদিকে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সম্পাদিত ‘সওগাত’ পত্রিকার উদারপন্থি ও প্রগতিশীল লেখকেরা (যাঁরা পরবর্তীতে ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ গঠন করেছিলেন) কোরবানির বাহ্যিক পশুবলির চেয়ে ‘আত্মবলি’ বা ‘ত্যাগের দর্শন’-কে বেশি প্রাধান্য দেন। মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন সফল করতে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের স্বার্থে মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন গো-কোরবানি সাময়িকভাবে কমানো বা পরিহার করা হয়। অন্যদিকে, লেখক শেখ রেয়াজুদ্দীন আহমদ মনে করিয়ে দেন যে, রসুলুল্লাহ (সা.)-এর আমলে আরবে গরু ছিল অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য, সেখানে মূলত উট ও দুম্বা কোরবানি হতো। অতএব, বাংলায় ‘গরু কোরবানি’ দেওয়াটা কোনো ধর্মীয় বাধ্যতামূলক কিছু নয়, এটি নিতান্তই একটি অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়

১৯৫০-এর দশকে ‘জমিদারি উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইন’ পাসের মাধ্যমে হিন্দু জমিদারদের পতন ঘটে এবং পূর্ব বাংলায় মুসলিম মধ্যবিত্তের একচ্ছত্র সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্থানের পর উনিশ শতকের সেই সামন্ততান্ত্রিক ও সামাজিক বিতর্কের অবসান ঘটে। তবে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ও যান্ত্রিক সমাজে কোরবানিকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ নতুন কিছু তর্ক-বিতর্কের জন্ম হয়। 

গ্রামীণ ও আধ্যাত্মিক স্তরের মরমি সাধকেরা কোরবানির বাহ্যিক রূপের চেয়ে ‘মনের পশু কোরবানি’ দেওয়াকে আসল মনে করেন। এর বিপরীতে সংস্কারপন্থি আলেম ও সাহিত্যিকরা একে ‘ইসলামি শরিয়তের পরিপন্থি’ বলে সমালোচনা করেন এবং পশুবলিকে অকাট্য বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

চামড়ার অর্থনীতি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিতর্ক বর্তমান বাংলাদেশের অন্যতম বড়ো আর্থ-সামাজিক বিষয়। কওমি ও দ্বীনি মাদ্রাসাগুলোর বার্ষিক বাজেটের একটি বিশাল অংশ আসে কোরবানির পশুর চামড়ার টাকা থেকে। বিগত এক দশকে চামড়ার বাজারে ধস নামাকে ওলামারা একটি ‘পরিকল্পিত অপচেষ্টা’ হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে মুক্তবাজার অর্থনীতিবিদদের যুক্তি, চামড়ার মূল্যের বর্তমান এই বেহাল দশার পেছনে দায়ী হচ্ছে সাভার চামড়া শিল্পনগরীর পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা ও জোগানের সংকট।

আধুনিক মেগাসিটিতে প্রতি বছর ঈদের দিন যত্রতত্র পশু জবাইয়ের ফলে পরিবেশগত সংকটের সৃষ্টি হয়, যা মারাত্মক দূষণ তৈরি করে। এবার ঢাকা শহরের মেট্রোরেল সংলগ্ন স্থান সহ বিভিন্ন স্থানে কোরবানি গরু প্রদর্শনীর সমালোচনা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মে ব্যাপকভাবে উঠে এসেছে। পরিবেশবাদীরা মনে করেন—নির্দিষ্ট ‘স্লটার হাউজ’ বা পৌর জবাইখানায় কোরবানি বাধ্যতামূলক করা হোক। এর বিপরীতে ঐতিহ্যপন্থিদের যুক্তি হলো, নিজের বাড়ির সামনে কোরবানি দেওয়াটা এ দেশের ঈদ উৎসব কেন্দ্রিক সংস্কৃতির বাইরের কিছু নয়। নতুন প্রজন্মকে এটি সরাসরি ত্যাগের শিক্ষা দিতে পারে বলে তারা মনে করেন। 

কোরবানি নিয়ে নিরামিষভোজী ও ডিজিটাল যুগের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বও সাম্প্রতিককালে ঘনিয়ে ওঠা আলোচনার বড়ো জায়গাজুড়ে। বিশ্বজুড়ে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে একদল তরুণ পশুবলির পরিবর্তে গাছ লাগানো বা অর্থ দানের প্রস্তাব তোলেন। বিপরীতে পুষ্টিবিদরা দেখান যে, কোরবানি মূলত একটি সুষম প্রোটিন বণ্টনের সামাজিক উৎসব, অধিকন্তু এর ওপর গ্রামীণ অর্থনীতি নির্ভরশীল। ব্যস্ত নাগরিক শ্রেণির কাছে ডিজিটাল পশুর হাট ও অনলাইন কোরবানির পশু প্রদর্শন আশীর্বাদ হলেও, ঐতিহ্যবাদীদের মতে এটি উৎসবের মূল চেতনা ও ‘সামাজিক স্পর্শ’-কে যান্ত্রিক করে ফেলছে। সাম্প্রতিক সময়ে ‘কোটি টাকার গরু’ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘রিলস’ বানানো বা অহংকার করাকে প্রগতিশীল আলেম ও সমাজচিন্তকেরা কোরবানির মূল স্পিরিট বা ‘তাকওয়া’র পরিপন্থি বলে সমালোচনা করছেন।

পরিশেষে বলা যায়, উনিশ শতকের শুরুতে কোরবানি ঈদ ছিল কেবল সুবেদার ও নবাবদের অবরুদ্ধ প্রাসাদের একচেটিয়া উৎসব। বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন, শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশ এবং মুসলিম মধ্যবিত্তের হাত ধরে আজ তা সর্বসাধারণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। উনিশ শতকে বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল সামন্ততান্ত্রিক ও সামাজিক টানাপড়েন। একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই বিতর্ক রূপ নিয়েছে অর্থনীতি, পরিবেশ, ডিজিটাল জীবনবোধ এবং আধুনিক বনাম ঐতিহ্যবাহী জীবন দর্শনের দ্বন্দ্বে। উৎসবের মোড়ক ও তর্কের অভিমুখ বদলালেও, কোরবানি ঈদ কেন্দ্রিক বাঙালি মুসলমানের চিন্তা-বিকাশের এই ধারা সমাজ-সংস্কৃতিতে প্রাসঙ্গিক, জীবন্ত ও অনপেক্ষণীয়।

রবীন্দ্রনাথের বিশ্বপথ: এক অখণ্ড নীড়

 ডেইলি স্টার লিঙ্ক : রবীন্দ্রনাথের বিশ্বপথ: এক অখণ্ড নীড়

১৯৩২ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইরান ও ইরাক সফর করেছিলেন। সেই সফরের অভিজ্ঞতার বিস্তারিত তিনি লিখেছেন তার ‘পারস্যে’ ভ্রমণকাহিনিতে। এতে প্রকাশিত আবেগ ও অনুভূতি কবির বিশ্বজনীন ভাবনার স্পর্শে অনন্য মাত্রা পেয়েছে। 

বিশেষ করে, এর বড় অংশজুড়ে ফুটে উঠেছে মুসলিম বিশ্বের প্রতি রবীন্দ্রনাথের গভীর শ্রদ্ধা ও আত্মিক টান। তিনি পরম মমতায় এঁকেছেন কবি হাফিজ ও রুমির আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারকে।

ইরানে হাফিজ শিরাজির সমাধিতে বসে কবি পরম শান্তি অনুভব করেছিলেন, সেখানে কিছুক্ষণ ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের চোখ ভরা ছিল অশ্রু, ছিল এক অমোঘ সত্য প্রেমের উপলব্ধি।

 বিস্তারিত : রবীন্দ্রনাথের বিশ্বপথ: এক অখণ্ড নীড়

জন্মদিন

 বঙ্গনিউজ প্রতিবেদন



বঙ্গ নিউজ সেলিব্রেশন






বাংলা থিয়েটার সেলিব্রেশন

মির্জা গালিব, ইকবাল ও বাংলা গজল (পর্ব-২)

মির্জা গালিব, ইকবাল ও বাংলা গজল 

আলাপ : দ্বিতীয় পর্ব

দারুণ এক জায়গায় আমরা থেমেছিলাম। জনাব তসলিম হাসানের বয়ানে আমরা জেনেছিলাম যে, গজল হচ্ছে আত্মার শূন্যতা, অন্তরের নিবিড় আর্তনাদ। কোনো নির্দিষ্ট ভাষার ব্যাকরণ কেবল নয় তা। রাজদরবারের আভিজাত্য চুঁইয়ে গজল এসে মিশেছে সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনে, তাদের হাহাকারের সঙ্গে। এক্ষেত্রে দেশে দেশে পার্থক্য নেই। পারস্যের মরমী সুর আর বাংলার মাটির বৈষ্ণব পদাবলি একই সমান্তরালে প্রেম ও বিরহকে খুঁজেছে। সত্যিকার অর্থেই এটি আমাদের সাহিত্যের এক অনন্য অধ্যায়।

গজলের ওই যে ‘রেকতা’ বা লোকজ ভাষায় রূপান্তরের ইতিহাস, তা আজ আমাদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—আমির খসরু থেকে গালিব, ইকবাল কিংবা আমাদের নজরুল; তাঁরা কীভাবে এই বিরহী সুরকে আধুনিক জীবনে প্রতিস্থাপন করলেন? নাগরিক এক বিচ্ছিন্ন সময়ে, গজলের সেই ‘মরণ আর্তনাদ’ কি আমাদের নতুন কোনো আধ্যাত্মিক পথ দেখাবে? এ বিষয়গুলো ১ম পর্বে উঠে এসেছিল। এইসব গভীর জিজ্ঞাসা আর বাংলা গজলের বিবর্তনের বাকি পথটুকু নিয়ে আমরা ফিরছি আলোচনার দ্বিতীয় পর্বে। ততক্ষণ গজলের আচ্ছন্নতায় ডুবে থাকুক আমাদের মন।

উপন্যাসের রাজনীতি ও শৈল্পিক সততা







উপন্যাসের অন্দরমহল: আলাপচারিতা (পর্ব-৩)

সূত্রধর: খোরশেদ আলম

বক্তা: হামীম কামরুল হক

‘উপন্যাসের অন্দরমহল: আলাপচারিতা’র তৃতীয় পর্বে সূত্রধর খোরশেদ আলমের মুখোমুখি হয়েছেন কথাসাহিত্যিক ও সমালোচক হামীম কামরুল হক। এই পর্বেও তিনি তাঁর চিরাচরিত নির্মোহ ও তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণে ব্যবচ্ছেদ করেছেন বাংলা উপন্যাসের গতিপ্রকৃতি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পাশ্চাত্য মনন’ থেকে শুরু করে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মায়াবী মোহনীয়তা’ হয়ে আলোচনা গড়িয়েছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’র রাজনৈতিক প্রজেক্ট পর্যন্ত। মাহমুদুল হকের ‘জহুরি’ দৃষ্টির সাথে ইলিয়াস বা হাসানের তুলনামূলক বিচার এবং দেশভাগ নিয়ে আবু জাফর শামসুদ্দীনের রাজনৈতিক সততার প্রসঙ্গগুলো এই আলাপকে এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছে। আদর্শিক জটিলতা আর শেকড়ের সন্ধানে মত্ত কথাসাহিত্যের ভেতরের সেই ‘মরমী অন্ধকার’ খোঁজার এক রুদ্ধশ্বাস প্রচেষ্টা ফুটে উঠেছে এই পর্বে। 

বিস্তারিত : শিশিরের শব্দ : https://wp.me/p46zKa-2oz

মুক্তচিন্তার অগ্নিপরীক্ষায় আবুল হুসেন

 

কালের ধ্বনি : এপ্রিল ২০২৬/বৈশাখ ১৪৩৩
সম্পাদক: ইমরান মাহফুজ
প্রধান সম্পাদক : আশিক রেজা



সবুজ পরি ও কাব্যের অভিযান

ছোটদের জন্য একটি লেখা ছাপা হলো "ছোটদের সময়" পত্রিকায়। মূলত কয়েকজন ছোট্টবন্ধু কীভাবে একটি পরিবেশ অভিযান চালায় তারই গল্প এটি। দূষণের পৃথিবী থেকে তারা নিজেরা যেমন মুক্তি চায়, তেমনি সবাইকে মুক্ত করতে চায়। "ছোটদের সময়", ঈদ সংকলন-২০২৬; ১৩ বর্ষ, ২য় সংখ্যা, মার্চ-এপ্রিল (সম্পাদক: মামুন সারওয়ার)