সাহিত্যের পটভূমি প্রাণ-প্রকৃতি

  

"সাহিত্যের পটভূমি প্রাণ-প্রকৃতি" : খোরশেদ আলম
“ভাষা ও গণতন্ত্র : রাষ্ট্র নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা”, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট।

বেশ্ব-বিদ্যালয় সন্দেশ

বিদ্যা-বিরাগী সুবিন্যস্ত (অ)ধী-পতি। পরিধেয় বস্ত্র ও অলঙ্কারে ধোপদুরস্ত। তার ময়ূর-আসনটি সুউচ্চ তাই নিম্নজন অন্তরাল থাকে। সদ্য পাওয়া ক্ষমতায় তিনি বেহুঁশ! মশহুর বিদুষকের দল আঠার মতো লেগে রইল। তেতে উঠলো স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল। ত্রিলোক কম্পিত হলো থরথর। ময়ূরচিহ্নিত আসনটির আশেপাশে কয়েকজন গো-বিদ্যান। তারা গবেষক, তাই ব্যস্ত, গো নিয়ে গো গো করছে।জেদেরও নাকি গো আছে! আর তা যদি গবেটের হয়, তো অন্যদের কপালে শনি। 


একজন বাজখাঁই, কণ্ঠনালী ও মন যার অঙ্কশাস্ত্রীয় মতে চলে। তিনি পণ্ডিতন্মন্য ও সাক্ষাৎ নিমাই। আপন বড়াই প্রকাশে বাড়াবাড়ির চোটে কপাল কোঁচকানো। স্বল্প চুলের কার্বন চশমায় তাকে সবচে পণ্ডিতপ্রবর বলে ভ্রম হয়। প্রকৃতপক্ষে তিনি শৃগাল শ্রেণির। প্রতিষ্ঠানের মস্তিষ্কলোকে সর্ববিদ্যার মালিশ-প্রলেপে তিনি সুমহান আতেলেকচুয়াল। তার কথা কিঞ্চিৎ পরে আসুক। 

ঔপন্যাসিক জহির রায়হান

 দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত : লিঙ্ক.খবরের কাগজ.কম

পিতামাতার ইচ্ছে ছিল মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ খান ডাক্তার হবেন। কিন্তু অনুরাগবশত বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হলেন। রায়হান নামে প্রবেশ করলেন লেখার জগতে। তারপর মূল নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হলেন জহির রায়হান। ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ফিকহ্ শাস্ত্রের শিক্ষক হয়েও পিতা ছিলেন ধর্মপ্রাণ, আদর্শবান ও উদারপ্রাণ। মাতা সৈয়দা সুফিয়া খাতুনের লেখাপড়া নবম শ্রেণি পর্যন্ত কিন্তু ছিলেন সচেতন মানুষ। বৃত্ত ভাঙার অন্তর্দৃষ্টি ও সত্যনিষ্ঠা ছিল তাঁর মধ্যে।  

জসীম উদ্‌দীন: বাংলার আকাশে ভিন্ন রং

‘খবরের কাগজ’-এ প্রকাশিতhttps://www.khaborerkagoj.com/golden-line/873569

১৯২৫ সাল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জসীম উদ্দীন। ‘কল্লোল’ পত্রিকায় ‘কবর’ কবিতা ছাপা হলো। তিন বছরের ব্যবধানে তা পাঠ্যপুস্তকেও স্থান পেল। ‘কবর’ গ্রামজীবনকে ধারণ করে নিরেট ভাবাবেগের, সত্য ও সুন্দরে মোহবিষ্ট কবিতা। বাংলার প্রকৃতি, মাটি ও মননকে জসীম উদ্দীন ভালোবেসেছিলেন হৃদয়ের গভীর থেকে। বোদ্ধা সাহিত্যমহলে একরকম উপেক্ষিত ছিল পল্লি-প্রকৃতি ও লোক-ঐতিহ্য। শহর তখন আমাদের আধুনিক কবিদের তীর্থভূমি।

অমিয়ভূষণের ‘মহিষকুড়ার উপকথা’ : লাঙ্গলের সঙ্গে লোভ

সংগ্রাম শান্তির প্রতীক হিসাবে তরবারি লাঙ্গল ইউরোপের মানুষেরা এতো বেশি প্রচার করেছে যে এখন আমাদের পক্ষে লাঙ্গলের সঙ্গে লোভ শব্দটাকে যুক্ত করতে সঙ্কোচ দেখা দিয়েছে।
মহিষকুড়ার উপকথা

মহিষকুড়ার উপকথা অমিয়ভূষণ মজুমদার অঙ্কন করেন জাফরুল্লা নামক এক সামন্ত প্রভুর চরিত্র। হান রুশ লেখক লিয়েফ তলস্তয় ভূমিকেন্দ্রিক মালিক ও দাসের সম্পর্ক তুলে ধরেছিলেন। বিশ্বসাহিত্যে বাংলাসহ নানা ভাষার সাহিত্যেই এই সম্পর্কের রসায়ন তুলে ধরা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত শিল্পী তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্টভাবে সামন্ত সমাজের ভাঙন নিয়ে উপন্যাস রচনা করেছেন। মহিষকুড়ার উপকথায় জাফরুল্লা এবং তাকে ঘিরে থাকা ভূমিদাস আসফাকরা যেন সেই উত্তরাধিকার। কালের ব্যবধান সত্ত্বেও, আসফাকের সমান্তরালে রয়েছে যেন করালীর মতো চরিত্র। মহিষকুড়ার উপকথায় জাফরুল্লা বাদেও সামন্তশ্রেণির অপর একজন প্রতিনিধি বুধাই রায়, যার প্রতাপে বাবার মৃত্যুর পর আসফাককে গৃহত্যাগ করতে হয়। সমগ্র বিশ্বেই দেখা যায়সাব-অলটার্ন বা নিম্নবর্গ সর্বদাই থাকে শোষকের শোষণযন্ত্রের তলায়। তারা জীবনের সবকিছুকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়। নিজেদের সংস্কৃতি, ধর্ম, বিশ্বাসনির্ভরতায় তাদের মধ্যে থাকে সহজ জীবন-অনুভব। তাদের আদিম প্রাকৃতিক জীবনের সরল অনুভবকে নষ্ট করে অর্থ-প্রতিপত্তির মালিকরা।

কারবালার শোকসাহিত্য : ‘মর্সিয়া’ ও ‘নওহা’

মর্সিয়া (مرثیہ) ও নওহা (نوحہ)—এই দুই প্রকার শোককবিতা কারবালার ট্র্যাজেডিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। বহু শতাব্দীর পুরোনো সাহিত্যিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য রয়েছে এই ধারা দুটোর। বিশেষ করে উর্দু, ফারসি ও আরবি ভাষায় রচিত, পরে বাংলা সাহিত্য এর প্রভাবপুষ্ট হয়েছে। বাংলা ভাষার কবিরা কারবালার ট্র্যাজেডিকে কেন্দ্র করে মর্সিয়ার বৈশিষ্ট্যবাহী বহু শোকগীতি, ছড়া, গান, কবিতা রচনা করেছেন। মীর মশাররফ হোসেন গদ্যকার হলেও মর্সিয়ার আবেগ, কাঠামো ও উদ্দেশ্যকে রূপান্তর করেছেন। বস্তুত তিনি একটি স্বতন্ত্র শোকসাহিত্য নির্মাণ করেছেন। ‘বিষাদসিন্ধু’র অন্তস্থ ভাব ও আবেগ গদ্য-মর্সিয়া হিসেবে বাংলা সাহিত্যে অনন্য।