সমাজ ও মানুষ মূলত পরিবর্তনশীল। তাদের মূল্যবোধ যেমন পালটে যায়, তেমনি সুবিধাবাদী ভোলও উলটে যায়। নজরুলের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। তাঁর কঙ্কর বিছানো পথে একদিন নিজেরাই তারা হোঁচট খেয়েছিল। কিন্তু তারাই আবার খননযন্ত্র হাতে নিয়ে সেই বন্ধুর পথ সমতল করতে ব্যস্ত। ভবিষ্যতের সমাজ এককালের ‘বিতর্কিত’ শিল্পীকে নিজস্ব আয়নার মুখোমুখি করতে চায়। এমতাবস্থায় এক ধরনের অদ্ভুত ও মজাদার মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ঘটে। সমকালে সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান যাকে প্রতিনিয়ত দৌড়ের ওপর রেখেছিল, মহাকালে তাঁকেই সিংহাসনে বসিয়ে দেবতা বানানোর ধুম পড়ে যায়। কিন্তু কেন এই উত্তরসূরিরা পরবর্তী সময়ে স্ব-রুচির বাইরের শিল্পীকে ‘নিজের’ করে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে? তেতো সত্য হচ্ছে— চারিত্রিক, মানসিক বা আদর্শিক দিক থেকে তারাই তো আগের সেই দমনকারীদের প্রতিরূপ !
ক্ষমতার চিরন্তন খেলা এটাই। সমকালে যে-সত্য শাসক ও সমাজকে আঘাত করে, উত্তরকাল সেই সত্যকেই ‘মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্রোপচার’ বা হাইজ্যাক করে। এর সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে স্পর্ধিত, আপোশহীন কণ্ঠস্বর কাজী নজরুল ইসলাম। এর জীবন্ত প্রমাণ নজরুলের জীবন, সাহিত্য ও রাজনৈতিক সংঘাতের ইতিহাস। সমকালের ‘বিতর্কিত’ নজরুল কীভাবে মহাকালের ‘গৃহপালিত’ দেবতায় রূপান্তরিত হলেন, এবং কীভাবে তাঁর বিপ্লবী চেতনাকে ছেঁটে ফেলে তাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের এক ঐতিহাসিক ভণ্ডামি শুরু হলো, তা বুঝতে হলে অতীতের নজরুল-বিতর্ক এবং বর্তমানের আত্মীকরণের মনস্তাত্ত্বিক যোগসূত্রটিকে নিবিড়ভাবে ব্যবচ্ছেদ করতে হবে।
সমকালের আয়নায় নজরুল অবশ্যম্ভাবীরূপে ‘বিতর্কিত’ ছিলেন। সংবেদনশীল সাহিত্যিক হিসেবে তিনি সমাজ, রাষ্ট্র বা প্রচলিত ব্যবস্থার বিপরীতে দাঁড়িয়েছিলেন। ফলে ‘ন্যায়ের পক্ষে’ থাকা সত্ত্বেও তিনি তীব্র বিরোধের মুখে পড়েন। সাহিত্যের ইতিহাস কালে কালে প্রমাণ করেছে যে, নিখাদ সত্য ও ন্যায়নিষ্ঠ অবস্থানই একজন লেখককে সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত ও একঘরে করে তোলে। নজরুলকে নিয়ে ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে মূলত ১৯২০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯২৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে।
সমাজ সবসময় কিছু অলিখিত নিয়ম, অন্ধবিশ্বাস বা নিজেদের তৈরি করা ‘মিথ’ আঁকড়ে ধরে বাঁচে। নজরুল সেই প্রচলিত সামাজিক ‘মিথ’ ও ‘ট্যাবু’তে আঘাত করেছিলেন। নজরুল তাঁর সাহিত্য ও দর্শনে অসাম্প্রদায়িকতা, প্রগতিশীলতা এবং হিন্দু-মুসলিম মিশ্র ঐতিহ্যের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। আর এতেই তিনি হয়েছিলেন স্বার্থবাদীদের চক্ষুশূল। তৎকালীন হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের রক্ষণশীল সমাজ তাঁকে মেনে নিতে পারেনি। তারা নজরুলের কণ্ঠকে তাদের অস্তিত্ব ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হিসেবে দেখলেন। ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতার বক্তব্য হয়ত সবাই জানেন। কার না গায়ে আগুন ধরবে এসব কথা বললে? “মৌ-লোভী যত মৌলভী আর ‘মোল্লা’রা ক’ন হাত নেড়ে’/, ‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!’/ ফতোয়া দিলাম– কাফের কাজী ও/যদিও শহীদ হইতে রাজী ও/ আমপারা পড়া হামবড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!/হিন্দুরা ভাবে– পার্শী শব্দে কবিতা লেখে, ও-পা’ত নেড়ে!”
১৯২৭ সালের দিকে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের একটি অংশ, বিশেষত তৎকালীন বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা ‘শনিবারের চিঠি’ নজরুলের সাহিত্যিক কৌশল ও ভাবধারাকে প্যারডি করে তীব্র আক্রমণ শুরু করে। ঠিক একই সময়ে (১৯২৭ সালে) মুসলিম সমাজের কট্টর বা রক্ষণশীল অংশও নজরুলের লিখনশৈলী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে থাকে। তৎকালীন ‘ইসলাম দর্শন’ এবং ‘মোসলেম দর্পণ’ নামের পত্রিকাসমূহ নজরুল-সাহিত্যের তীব্র এবং বিরূপ সমালোচনা করতে থাকে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক নজরুল-বিরোধিতা চরম রূপ নেয় ১৯২৮ সালে। কলকাতায় মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ সম্পাদিত অত্যন্ত প্রভাবশালী মাসিক ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকা আনুষ্ঠানিকভাবে নজরুলের উদারপন্থি চিন্তা ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তবে এই সংকীর্ণতার বিপরীতে ‘কল্লোল’ ও ‘কালিকলম’-এর মতো প্রগতিশীল সাহিত্য পত্রিকাগুলো এবং মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সম্পাদিত ‘সওগাত’ পত্রিকা নজরুলের পক্ষে বলিষ্ঠ ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। ‘সওগাতে’ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে আবুল কালাম শামসুদ্দীন নজরুলকে ‘যুগপ্রবর্তক কবি’ এবং ‘বাংলার জাতীয় কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে উপযুক্ত জবাব দেন। এক সময় নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’-এর ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। এই আন্দোলন প্রথাবাদী সমাজ-ভাবনার বিপরীত মেরুর প্রতিনিধিত্ব করত এবং বিতর্ককে আরও উসকে দিত। ফলে নজরুল তখনও হলেন কারো কারো বিরোধী ব্লকের মানুষ।
রাষ্ট্র ও ক্ষমতার নগ্ন সত্য প্রকাশ করলে ক্ষমতাবানরা সাধারণত চটে যান। ক্ষমতা বা শাসকগোষ্ঠী সবসময় নিজেদের মতো করে একটা ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করে। আসলে নজরুল ক্ষমতার নগ্ন সত্য প্রকাশের পক্ষের লোক ছিলেন, তোষামোদির বিপরীতে শোষিত মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি ব্রিটিশ রাজের অন্যায়, দুর্নীতি ও স্বৈরাচারী মনোভাবকে সাহিত্যের পাতায় তুলে ধরেন। ১৯২২ সালে ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার আগমনী সংখ্যায় নজরুলের রাজনৈতিক কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ প্রকাশিত হলে ব্রিটিশ সরকার এটিকে চরম রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে ঘোষণা করে এবং সংখ্যাটি নিষিদ্ধ করে। ১৯২৩ সালের জানুয়ারিতে রাজদ্রোহের অভিযোগে নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতে নজরুলের দেওয়া জবানবন্দি (যা ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে খ্যাত) সে-সময় ব্রিটিশ আইনের বৈধতা ও ঔপনিবেশিক শাসনতন্ত্রকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করে ভারতীয় সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনিই প্রথম এত স্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার দাবি তোলেন। কিন্তু সেটি তৎকালীন অনেক নরমপন্থী ভারতীয় রাজনীতিকদের তীব্র অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে।
সময়ের স্রোত ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির বিপরীত অবস্থান সাহিত্যিকদের শত্রু করে তোলে। অনেক সময় পুরো সমাজ, এমনকি বুদ্ধিজীবী মহলের বড়ো অংশ সাময়িক আবেগ ও সুবিধাবাদ-ঘেঁষা রাজনীতির পেছনে অন্ধের মতো ছুটতে থাকে। নজরুলকে নিয়েও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য-বিরোধী নজরুল ১৯১৭ সালের রুশ বলশেভিক বিপ্লবের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। সেটা ছিল ঐকান্তিকভাবে তাঁর স্বপ্রণোদিত চৈতন্যের ফল। ‘লাঙল’ (১৯২৫) ও ‘গণবাণী’ (১৯২৬) পত্রিকার মাধ্যমে তিনি কৃষক, মজুর ও কুলি শ্রেণির অধিকারের কথা বলেছিলেন। তৎকালীন প্রচলিত পুঁজিপতি, ভূস্বামী ও বুর্জোয়া রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো এই অর্থনৈতিক সাম্যের বয়ানকে মোটেও ভালো চোখে দেখেনি। এমনকি ১৯২৬ সালের কেন্দ্রীয় আইন পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্রভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে বৃহত্তর রাজনৈতিক দলগুলোর (যেমন কংগ্রেসের রক্ষণশীল অংশ) সাথে তাঁর সাংঘাতিক দূরত্ব ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। একইভাবে, ভারতীয় মুসলিম সমাজ যখন ঐতিহ্যগত ‘খেলাফত আন্দোলন’ নিয়ে ব্যস্ত, নজরুল তখন তুরস্কের মোস্তফা কামাল পাশার আধুনিক ও গোঁড়ামিমুক্ত সংস্কারপন্থি ধারণাকে সমর্থন করে ‘কামাল পাশা’ বা ‘আনোয়ার পাশা’র মতো কবিতা লেখেন। এই বিপরীতমুখী অবস্থান তৎকালীন নেতাদের সঙ্গে তাঁর স্থায়ী রাজনৈতিক দূরত্বের জন্ম দেয়।
তবে মহাকালের রূপান্তরে আজ উত্তরসূরিরা নজরুলকে ‘নিজের’ করতে চায়। কিন্তু কেন? সমকালে নজরুলকে তো হিন্দু-মুসলিম উভয় পক্ষের লোকেরা আক্রমণ করেছিল। নজরুলকে যে-ঔপনিবেশিক শক্তি খাঁচায় পুরেছিল, তারাই তাঁর আপনজন হতে ব্যস্ত। বর্তমানে উপনিবেশ নেই কিন্তু বহাল তবিয়তে মগজের উপনিবেশটা রয়েই গেছে। আজ দেখা যাচ্ছে—সেই দমনকারীদের মতোই আধুনিক উত্তরসূরিরা নজরুলকে নিজেদের আদর্শিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ‘ব্র্যান্ড’ বানানোর জন্য মরিয়া। এই যে এককালের ‘বিতর্কিত’ শিল্পীকে পরবর্তী সময়ে ‘নিজের’ করে নেওয়ার ঐতিহাসিক ভণ্ডামি—এর মনস্তত্ত্ব, সামাজিক ও নেপথ্যের রাজনীতি খতিয়ে দেখা জরুরি।
সাহিত্যিকের ন্যায় ও সততাকে যখন কেউ পুঁজি করতে চায় তখন একদিকে থাকে ‘অপরাধবোধ’ মোচনের চেষ্টা, অন্যদিকে থাকে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর নিজেদেরকে প্রগতিশীল প্রমাণ করার চেষ্টা। সময় বদলে যাওয়ার সাথে সাথে যখন পরিষ্কার আকাশ দেখা যায়, স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ওই শিল্পী আসলে সত্য এবং ন্যায়ের পথেই ছিলেন, তখন সামগ্রিক সমাজ তাঁকে নিজের অধিকারে নিতে ব্যস্ত হয়। পরবর্তী প্রজন্মের শোষক, রক্ষণশীল বা সুবিধাবাদীরা আর ‘ইতিহাসের খলনায়ক’ হয়ে থাকতে চায় না। তারা সেই শিল্পী বা সাহিত্যিকের মহত্ত্বের অংশীদার হয়ে নিজেদের অতীত পাপ বা সংকীর্ণতা ধুয়ে ফেলতে চায়। শিল্পীকে নিজের দলের বা মতাদর্শের লোক বলে দাবি করে তারা সমাজে নিজেদের ‘উদার’ ও ‘প্রগতিশীল’ হিসেবে জাহির করার সুযোগ খোঁজে।
তারা ধুমসে শিল্পীর ‘কালজয়ী জনপ্রিয়তাকে’ পুঁজি করা শুরু করে। নজরুল যখন মহাকালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সর্বস্তরের মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন, তখন দমনকারীরা তাদের রণকৌশল বদলে ফেলেছে। যখন তাঁর এই সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তাকে আর কোনো ক্ষমতা বা কুৎসা দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়, তখন তারা ভাবে—যেহেতু ধ্বংস করা গেল না, তাই এবার তাঁকে নিজেদের কাজে লাগানো যাক। এজন্যই তারা নজরুলের জনপ্রিয়তাকে নিজেদের রাজনৈতিক, সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে ‘ব্র্যান্ড’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। শিল্পীর চিন্তাধারাকে ধারণ করার ভান করে তারা মূলত নিজস্ব ক্ষমতার ভিত্তিকে শক্ত করে।
মৃত সাহিত্যিক বা শিল্পী সাধারণত নিরীহ হন। না হয়েও তাঁর উপায় নেই। কারণ অন্যেরা তাঁকে তখন ইচ্ছেমতো বানিয়ে তোলায় মত্ত হয়। শিল্পীর ধারালো সত্যকে ‘ভোঁতা’ করে দেওয়াও তখন নিজেদের করায়ত্তে থাকে। একজন জীবন্ত নজরুল বিপজ্জনক ছিলেন, কিন্তু একজন মৃত নজরুল সম্পূর্ণ নিরীহ। তিনি আর নতুন করে কোনো ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ লিখতে আসবেন না, শাসকের ভিত কাঁপাতে আসবেন না। সুবিধাবাদীরা তাঁকে ‘নিজের’ করে নেয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর আসল বিপ্লবী চেতনা, শোষণের বিরুদ্ধে ধারালো বক্তব্য বা প্রতিবাদের সুরটিকে আস্তে আস্তে ‘সেন্সর’ করে নেয়। তাদের নিজস্ব কাটা খালের মিষ্টি পানিতে তাঁকে প্রবাহিত করে।
শিল্পীকে এমন এক রোমান্টিক বা তাত্ত্বিক মোড়কে বন্দি করা শুরু হয় যে, মনে হয় তিনি তাদের কত কালের আপন! তাঁকে ঘিরে শুরু হয়ে যায় প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের শত আয়োজন। তাঁকে নিজেদের জানালায় রঙিন কাচ হিসেবে প্রয়োগ করতে আর কোনোই অসুবিধা থাকে না, যেমন থাকে না রঙিন চশমায় দুনিয়া দেখার কাজটা। অন্যদিকে আরেক দল ব্যস্ত থাকেন, যাতে তাঁর সাহিত্য কেবল ড্রয়িংরুমে শোভা পায়। কিন্তু সমাজকে কোনোভাবেই যেন তা ঝাঁকুনি দিতে না পারে, সে ব্যাপারে বন্দুক নিয়ে পাহারা দেয়। শিল্পীর তেজকে ‘ভোঁতা’ করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো তাঁকে দেবতার আসনে বসিয়ে পুজো করা। ফুল আর চন্দনে তাঁর দ্রোহের আগুনকে আড়াল করাই এই ভণ্ডামির মূল লক্ষ্য।
যারা একসময় অন্যায়ের পক্ষে ছিল, তাদের উত্তরসূরিরা সবসময় ইতিহাসের পাতায় নিজেদের পূর্বসূরিদের কলঙ্ক ঢাকতে চায়। একেই বলা যেতে পারে ‘ইতিহাস পুনর্লিখনে’র চেষ্টা। তারা প্রচার করতে শুরু করে যে, তাদের পূর্বপুরুষদের সাথে নজরুলের আসলে কোনো মৌলিক বিরোধ ছিল না, কেবলই “একটু ভুল বোঝাবুঝি” হয়েছিল আরকি! আহা! নজরুল তো তাদেরই চিন্তাভাবনার আদি রূপকার ছিলেন! এভাবে ইতিহাসকে বিকৃত করে নিজেদের অতীত ও বর্তমানের অপরাধকে বৈধতা দেওয়া হয়।
এমনিভাবে ভণ্ডরা যে-কোনো সাহিত্যিক বা শিল্পীকে বর্তমানের যোগসূত্রে বেঁধে ফেলার কাজটা সুসম্পন্ন করেন। একই সূত্রে আবদ্ধ করে নজরুলকেও খণ্ডিত করার আধুনিক উৎসব শুরু হয়। আজকের সমাজে নজরুলকে ‘নিজের’ করার এই লড়াই এক কুৎসিত রূপ নিয়েছে। বর্তমানের বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নজরুলকে তাঁর সামগ্রিকতায় গ্রহণ করতে ভয় পায়; কারণ সামগ্রিক নজরুলকে গ্রহণ করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়বে। তাই তারা নিজেদের সুবিধার্থে নজরুলকে খণ্ডিত করে নেয়। একদল তাঁর সাম্যবাদী ও বিপ্লবী চেতনাকে সম্পূর্ণ আড়াল করে কেবল তাঁর ইসলামি গজল ও হামদ-নাতগুলোকে সামনে আনে, যাতে তাঁকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে ফেলা যায়। তারা ভুলে যেতে চায় যে এই নজরুলই লিখেছিলেন—”মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।” অন্য দল দাঁড় করান নজরুল-ব্যবহৃত ঐতিহ্যের অপব্যাখ্যা। তাঁর শ্যামাসঙ্গীত, কীর্তন বা রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক গানগুলোকে বড়ো করে দেখিয়ে তাঁর ভেতরের অকৃত্রিম মুসলিম ঐতিহ্যচেতনা, স্বাজাত্যবোধ ও আরবি-ফারসি শব্দের সার্থক প্রয়োগকে অস্বীকার করতে চান। কেউ কেউ তাঁকে বিপ্লবী মহামন্ত্রের আলখাল্লা পড়ান। কিন্তু নজরুল নিজেই বলেন, “আনকোরা যত ননভায়োলেন্ট নন-কো’র দলও নন্ খুশী।/ ‘ভায়োলেন্সের ভায়োলিন্’ নাকি আমি, বিপ্লবী-মন তুষি!/ ‘এটা অহিংস’, বিপ্লবী ভাবে, ‘নয় চরকার গান কেন গা’বে?’/ গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কন্ফুসি!/ স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের অঙকুশি!” ফলে নজরুলকে বিশেষ কোনো রঙে যখন বাঁধা যায় না, তখন অন্ধের হস্তী-দর্শনের মতো কেউ লেজ ধরেন, কেউ হস্ত, কেউ বা পদযুগল।
সবচেয়ে বড়ো ভণ্ডামিটি করে আধুনিক শাসক ও পুঁজিপতি শ্রেণি। তাদের দ্বিচারিতায় আকাশ বাতাসও অট্টহাসি দিয়ে ওঠে। তারা সুসজ্জিত মঞ্চে দাঁড়িয়ে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ বা ‘সর্বহারা’ কবিতার আবৃত্তি করে (বা শুনে) হাততালি দেয়, বাহবা কুড়ায়। কিন্তু সেই কবিতায় তো শোষকের অত্যাচারী খড়্গ কৃপাণ উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোলের সাথে যুক্ত ছিল! নিজেদের শাসন ও শোষণ ব্যবস্থায় সেই একই উৎপীড়ন জারি রেখে তারা নজরুলকে কেবলই একটি রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় রূপান্তর করে। যে কুলি-মজুরের পক্ষে নজরুল কলম ধরেছিলেন, আজ সেই কুলি-মজুরের অধিকার হরণকারীরাই নজরুলের জন্ম বা মৃত্যুবার্ষিকীতে কোটি টাকা খরচ করে উৎসব করে। এটাই হলো ‘ধূমকেতুকে খাঁচাবন্দি’ করার আধুনিক উৎসব।
সমকালের শোষকরা নজরুলকে করত ‘কারারুদ্ধ’, আর বর্তমানের সুবিধাবাদীরা নজরুলকে করে ‘কক্ষচ্যুত’ ও ‘গৃহপালিত’। দুই যুগের পদ্ধতি ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য এক— নজরুলের সত্যের ধারালো তেজ থেকে নিজেদের আড়াল করা এবং তাঁর জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে নিজেদের বৈতরণি পার হওয়া। অতীত আর বর্তমানের এই যোগসূত্রটি আসলে শোষক, শাসক ও সুবিধাবাদী শ্রেণির একটি চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক অ্যাজেন্ডা।
সমকালের ‘বিতর্কিত’ নজরুল আজ মহাকালের ‘জাতীয় কবি’ বা ‘মহা-মানব’। কিন্তু এই দেবত্ব আরোপের আড়ালে যে সীমাহীন ভণ্ডামি লুকায়িত, তা সচেতন পাঠককে অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে। তবে আশার কথা হলো, প্রকৃত শিল্পীর সৃষ্টিতে যে সত্য ও দ্রোহের বীজ থাকে, তা এতই শক্তিশালী যে, এই ভণ্ডামির ঝলমলে আবরণ ভেদ করেও তা প্রকৃত সত্যান্বেষী। শোষিত ও মুক্তিকামী মানুষের কাছে ঠিকই তা আদিম তেজ নিয়ে ধরা দেয়। শোষক আর সুবিধাবাদীদের দল যতই নজরুলকে নিজেদের ছাঁচে ঢেলে নিরীহ, খণ্ডিত বা গৃহপালিত করার চেষ্টা করুক না কেন, তাঁর কবিতার প্রতিটি লাইনে, তাঁর গানের প্রতিটি সুরে এবং তাঁর জীবনের প্রতিটি সংগ্রামে যে অনমনীয় দ্রোহের আলো, তা আজীবন তাদের ভণ্ড মুখোশটিকে উন্মোচন করেই যাবে। নজরুলকে যারা দেবতার সিংহাসনে বসিয়ে বন্দি করতে চায়, তারা ভুলে যায়— আকাশের ধূমকেতুকে কখনো কোনো সোনার খাঁচায় আটকে রাখা যায় না; সে তার কক্ষপথের আগুন নিয়ে ঠিকই একদিন শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসে। একজন হৃদয়বান শিল্পী নজরুলের পক্ষে মহাকালের অনির্বাপিত সত্য তো সেটাই।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন