একজন মানুষ শিল্পী হয়ে ওঠে কী কারণে? নিশ্চয়ই তার মধ্যে থাকে অন্তরের প্রবল অভিব্যক্তি। শুধু পারিপার্শ্বিকতা বড়ো কথা নয়, এর বাইরেও থাকে নিজস্ব উপলব্ধি, প্রবল হার্দিক তাড়না। এই অন্তর্চেতনা স্বকীয়, সহজাত, অনেক সময় স্বীয় কালের অক্ষরে ভাস্বর। তবুও কথা থেকে যায়, মানুষ কি পাখির মতো গান গাইতে পারে? মানুষের কি স্বাধীন একটা সত্তা আছে, যা তাকে ফুলের মতো নিজের অনুভবকে প্রকাশ করায়, পাখির মতো গলায় সুমিষ্ট সুর চড়ায়? হয়তবা তা করতে পারে, এজন্যই শিল্পের জন্ম হয়। পুরাতন পৃথিবী চির নতুন হয়ে ধরা দেয়। অনেক শিল্পবোদ্ধা এটাকে প্রেরণা, স্বর্গীয় ধারণা ইত্যাদি নামে অভিহিত করে থাকেন। আবার অনেকে মনে করেন, শিল্প আসলে চর্চার ফসল। হয়তবা শিল্প একইসঙ্গে দুটোই, কিংবা তার ভেতরে কোনো শক্তি একটি বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
এসবের চেয়েও বড়ো কথা, যাকে নিয়ে বলতে বসেছি, তিনি একজন সহজাত শিল্পী বা স্বভাবশিল্পী। আমাদের গ্রামীণ সমাজভিত্তিক স্বল্পশিক্ষিত, অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষের শিল্পবোধ, শিল্পমন কখনো কখনো শিক্ষিত মানুষকেও হার মানায়। কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি ভর করা বোদ্ধাজনকেও তা বিস্ময়ের রেখা টেনে দেয়। দাগ রেখে যায় ভবিষ্যতের, অমোঘ কালের, স্বভাবের, হৃদয়ের। প্রাচীনকালের কিংবা মধ্যযুগের অথবা আধুনিককালেও স্বভাব কবিদের কথা ভাবলে, সে-কথা যেন এমনিতেই পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
এতখানি ভূমিকা যার জন্য, তিনি আর কেউ নন, গ্রামীণ শিল্পী রিজু আহমেদ। পালাগানের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রকাশ। তাঁকে লোকপালার আসর থেকেই আমার চিনে নেওয়া। তবে এই চেনাশোনার বাইরেই তিনি একজন প্রকৃত শিল্পী, সংগীতের অপূর্ব সমঝদার। গাইবান্ধার দারিয়াপুরে অবস্থিত একটি থিয়েটার, নাম ‘সারথি’। এই থিয়েটারেই শিল্পী রিজু আহমেদের বেড়ে ওঠা, এর মাধ্যমেই সামনে আসা। তবে তাঁর গলায় গানের প্রথম সুর ওঠে মাঠে ঘাটে, উদাসী বনের বাঁকে বাঁকে।
রিজু আহমেদের সঙ্গে দেখা হলেই আমার সঙ্গে রহস্যময় সব আলাপ হয়। অনুভবের গহন কন্দরে বসে দু চারটে অমিয় কথার লেনদেন হয়। সেটি জনপ্রকাশ্য নয়, অবশ্যই অতল মনের আনন্দ সাঁতারে। আমাকে কথায় কথায় তিনি একদিন বলছিলেন, “দেখেন, আমি যখন ভ্যান নিয়ে রাস্তায় বের হই, যখন খোলা মাঠের পাশ দিয়ে ভ্যানগাড়ি চলে, তখন মনটা আঁকুপাঁকু করে ওঠে। ভ্যানগাড়ি চলছে তো চলছেই, আর আমার গান এমনিতেই গলা দিয়ে বের হয়ে আসে। এই সুরের জন্য কোথা থেকে কী আমাকে ভর করে, আমি নিজেও তা জানি না। আর সেই গান গাওয়ার মধ্যে যে কী আনন্দ ভাষায় বোঝাতে পারি না !” রিজু আহমেদ এভাবেই কথা বলেন। তিনি আনুষ্ঠানিক বা প্রমিত ভাষায় খুবই গোছানো কথক।
আসলে রিজু আহমেদের হৃদয় থেকে উঠে আসে সুর। মানুষের অন্তর ভেদ করে গীতরসধারার তার ফল্গুস্রোত বয়ে চলে আপন খেয়ালে। পথচারীরা অবাক হয়ে তাঁর দিকে একঝলক তাকিয়ে থাকে। কেউ কেউ অনেকক্ষণ অনুসরণ করে। বস্তুত মানুষের মধ্যে একটা শিল্পরসিক মন থাকে। সেই রসিক মনটা শিল্পের রস আহরণে আপনিই সমর্পিত থাকে। আর এই সমর্পণের স্বত্ব নিয়েই রিজু আহমেদের শ্রোতারা তাঁর সুরের অনুসরণ করে। তারা উদ্গ্রীব হয়ে কান পেতে থাকে, রিজু আহমেদ কখন তাঁর চড়া সুরের টান দেবেন খালি গলায়! অমিয় সুধা ছড়াবেন পথে পথে গভীর উষ্ণতায়!
রিজু আহমেদ হারমোনিয়ামেও গান করতে পারেন, এটা তাঁর গানের সুর বন্ধনের বাড়তি সুবিধা। ফলে গানের বাণীর সঙ্গে তাল-লয়ের ব্যাকরণও তিনি ঠিক রাখতে পারেন অনায়াসে। এই সুরের বাঁধন তাকে ‘সারথি’ থিয়েটারে পালাগানের অনিবার্য শিল্পীতে পরিণত করেছে। অথচ অর্থাভাবে তিনি লেখাপড়া তেমন করতে পারেননি। অষ্টম শ্রেণি পাশ করে আর এগোয়নি পড়াশুনা। অল্প বয়সেই জীবনবৃত্তির হাতছানি, দিনমজুরি, সংসারের ঘানি। এমন অবস্থায় কজন মানুষ তাদের বিচলিত অবস্থা থেকে বের হতে পারে? এই নিত্যদিনের কষ্ট আর অভাব দারিদ্র্য তাঁকে শিল্পের পথ থেকে সরাতে পারেনি। বরং বেদনায় বেদনায় তিনি নির্মাণ করেছেন আপন কণ্ঠের কারিগরি। সেই জটিলতম বেদনা থেকে সৃজিত হয়েছে ঘনিষ্ঠতম জীবনের আখ্যান, নিবিড়তম স্বরের সাধনা। শুধু গানে নয়, অভিনয়েও তিনি আন্তরিক শিল্পী। নিজের কণ্ঠে ও অন্য পালা অভিনেতার কণ্ঠদানে তাঁর স্বভাবী গান এমনিতেই অলংকার সজ্জা তৈরি করে। এই অভিনয় অলংকরণে তাঁর হৃদয়ের উত্তাপ ধরা পড়ে। বোদ্ধা শিল্পজনের চোখ মোটেও এড়ায় না তা। অনেকের মাঝখানে থেকে তাঁকে তাই স্বতন্ত্রভাবে চেনা যায়। একাধারে তিনি হয়ে উঠেছেন লালনশিল্পী, পালাশিল্পী, লোক পালাকার, সর্বোপরি সুরের সাধক।
‘খৈলান পালা’, ‘রূপা’, ‘সান্দার কইন্যার পালা’, ‘কারবালায় নিদান’ সহ বিভিন্ন পালায় অভিনয় ও গান তিনি করেছেন। আমার স্বচক্ষে দেখা ‘খৈলান পালা’র তিনি প্রধান গায়েন ও শিল্পী। এই পালায় তাঁর পরিশ্রম ও গুণের কথা সত্যিই বর্ণনার অতীত। একবার কোনো এক গ্রীষ্মে তাঁর বাড়ির সন্নিকটে, বলা যায়, উঠানের পাশে পালা উপস্থাপনা হয়। সে-বারই আমার কাছে রিজু আহমেদকে একজন সত্যিকার শিল্পী বলে মনে হয়েছে। তখনই দেখেছিলাম, পেশায় ভ্যানচালক কি দিনমজুর এই মানুষটার মধ্যে কী বিরাট একটা আলোকিত বিশ্ব। বহু মানুষ গ্রামে-শহরে জ্ঞানী-গুণী বলে পরিচিত হন। কিন্তু এই রিজু আহমেদের ভেতরে অনন্য এক মানুষ বাস করে। সেই মানুষের সঙ্গে একজন শিল্পী বাস করে। গানের দরাজ গলা, বাদ্যবাজনা, অভিনয়, আত্ম-আবিষ্কার সবকিছু বিবেচনায় তিনি একজন কুশলী কারিগর। আমার সৌভাগ্য, স্বল্পতম সময়ের মধ্যেও এই মানুষটার অন্তর্লোকে প্রবেশে সক্ষম হয়েছিলাম। তাঁর ভেতরে লুকিয়ে থাকা মহিমাময় সত্তাকে অন্তরের গহন আলোয় অনুভব করতে পেরেছিলাম। এটাকে বলবো, সত্যিকারের শিল্প সংযোগ তথা শৈল্পিক এটাচ্মেন্ট। আমার ব্যক্তিগত শিল্প-অনুভবের জন্য তা ঐকান্তিকভাবে জরুরি বলে মনে হয়েছে। একজন পালা-শিল্পীর জীবনের অন্তর্বেদনা, অক্ষমতা, দারিদ্র্য, সর্বোপরি সেসব ছাড়িয়ে অন্তর্জ্ঞানের ছোঁয়া ও আলোকের প্রাণোচ্ছ্বটা-অনুভব— সবমিলে যেন এক অমিত অভিজ্ঞতার জগৎকে স্পর্শ করা। এই জগৎ কোনও কিছুর বিনিময়ে ক্রয় করা যায় না; শুধু হৃদয় দিয়েই তা অনুভব করা যায়।
গ্রাম থিয়েটার মানে বিরাট সংগঠন। তবে এর এতগুলো অঙ্গ-সংগঠন কিন্তু সব জায়গায় সমানভাবে বিকাশ ও বিস্তার লাভ করেনি। নানাবিধ বাস্তব সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে তাদের পথচলা। পথ চলতে চলতেই তাদের শেখা। চলতে চলতেই হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়া, পুনরায় উঠে দাঁড়ানো। আর বলা ভালো, গ্রাম-গঞ্জের থিয়েটারে নারীদের অংশগ্রহণ এমনিতে ক্ষীণ হয়, যদিও ‘সারথি’ তার কুশলী হাতে দক্ষ কিছু নারীশিল্পীর জন্ম দিয়েছে। সেখানে অনেকের পাশে রিজু আহমেদের স্ত্রী সহিদার একটা দারুণ ভূমিকা রয়েছে। রিজু আহমেদের চমৎকার এই দাম্পত্যসঙ্গী সহিদা একজন গায়েন ও পালাশিল্পী। তাদের একমাত্র ছেলে সোহাগের মা সহিদা। সংসার সামলে তিনি সবসময় এগিয়ে আসেন পালার জন্য। পালা যেন তার জীবনে আনন্দের অন্যতম উপকরণ। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবার একটুকরো খোলা বাতায়ন। বস্তুত আমাদের দেশের টিপিক্যাল নারীজীবন ও সংসার নামক পরাকাষ্ঠের বাইরে নারীও যে ভেতর থেকে আলোকিত হয়ে উঠতে পারে, জেগে থাকতে পারে সমগ্র শিল্পিসত্তা নিয়ে, তা সহিদাকে না দেখলে উপলব্ধি করা যায় না।
এ-সূত্রেই বলতে চাই, গ্রাম থিয়েটার সংগঠন ‘সারথি’কে নিয়ে। এর অবস্থান গাইবান্ধা জেলা শহরের অদূরে দারিয়াপুর নামক স্থান। সেই ১৯৯৫ সাল থেকে হাঁটি-হাঁটি পা পা করে তা আজকের অবস্থানে। তিন দশকেরও বেশি সময়ের একটি সাংগঠনের যাত্রা বেশ দীর্ঘপথ বইকি। এই থিয়েটারের কর্ণধার হয়ে শক্ত হাতে যিনি বইঠা চালাচ্ছেন, তিনি আর কেউ নন, আমাদের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন, গুণী নাট্যজন জুলফিকার চঞ্চল। তাঁর সঙ্গে যখনই কথা বলেছি, তাঁর মধ্যে একটা ঋণ-স্বীকারের গভীরতর হার্দিক সংস্কৃতিবোধের প্রকাশ লক্ষ করেছি। রিজু আহমেদকে আবিষ্কার ও প্রণোদনার নেপথ্যের কুশীলব তিনি।
এক একটা এলাকার একেকটা বৈশিষ্ট্য বা চারিত্র্য থাকে, ভাবাবেগ থাকে। এই চারিত্র্য ও ভাবাবেগ তৈরি করে দেন নেপথ্যের কিছু বড়ো মানুষ। ফলে দুই যুগেরও অধিক সময় ধরে মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে টিকে থাকা এই সংগঠনে বহু জ্ঞানীগুণী-মহাজন-চিন্তকদের প্রভাব পড়েছে। তাঁদের জ্ঞান ও সাধনার উত্তরাধিকার ঘটেছে। বাবা ত্রৈলোক্যনাথ বর্মণ, সুরেন্দ্রনাথ বর্মণ, কার্জন আলী সরকার, পরিতোষ কুমার বটু, কিরণময় বর্মণ, আব্দুস সাত্তার দরবেশ— এই রকম বহু জ্ঞানী-গুণীর অমিত জ্ঞানের প্রবাহ এই থিয়েটারের নেপথ্য শক্তি। এর মধ্যে কারো সমাজ-সংস্কৃতির গভীর জ্ঞান, কারো অর্থ ও দান, কারো সংগীত-জ্ঞান ও প্রয়োগ-দক্ষতা, কারো মনুষ্যত্বের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার ক্ষমতা—এখানে সবকিছুরই একটা ভূমিকা রয়েছে। একটি থিয়েটারের জন্য খুবই দরকার হয় নৃত্য, সংগীত, বাচিক শিল্পের উৎকর্ষ, শরীরচর্চা ইত্যাদি। এই সব কিছুর আয়োজনে ভরপুর ‘সারথি’। তাই ‘সারথি’ বহু শিল্পের সমন্বিত একটি অনন্য ও পরিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
‘সারথি’র গর্বিত অংশীজন, একজন নিভৃত জ্ঞানী সহচর শিল্পী রিজু আহমেদ। প্রকৃত শিল্পসত্তার ভেতর দিয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন মানুষের অন্তরে। আমি তাঁর অন্তর্জ্ঞান, স্বভাব শিল্পিতা, আবেগ ও গানের সুরে মুগ্ধ। তাঁকে প্রশংসা করা মানে, বিনীত সত্তার সঙ্গে থাকা, নিবেদিত আত্মার সঙ্গে কথা বলা। লালনশিল্পী, লোকশিল্পী, লোক পালাকার রিজু আহমেদের শৈল্পিকতার প্রতি আমি প্রণতি জানাই। শিল্পের আপন গতিতেই তিনি পরিচিত হয়ে উঠুন, তাঁকে চিনে নিক শিল্পের বৃহৎ পৃথিবী। এই হোক হৃদয়ের গহন তলে থাকা প্রত্যেকটি লোকপ্রাণ অনুভবী সত্তার আজ ও আগামীর প্রত্যাশা।
লেখক : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন