শেখ সাদির অমর গল্পটার কথা আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। পারস্যের বিখ্যাত কবি শেখ সাদি একবার অতি সাধারণ পোশাকে এক ধনকুবেবের ভোজসভায় গিয়েছিলেন। ছেঁড়া ও ধূলিমলিন পোশাক দেখে দারোয়ানরা তাঁকে ভেতরে প্রবেশ করাতে দ্বিধা করেছিল। অতিথিশালার মধ্যে তাঁর জন্য বরাদ্দ ছিল না কোনো সম্মানজনক আসন। খাবার যা দেওয়া হয়েছিল, তা-ও ছিল অবহেলার। সাদি কোনো কথা না বলে দস্তরখানায় নীরবে বসে পড়েন।
পরদিন তিনি পরিধান করলেন রাজার মতো জাঁকজমকপূর্ণ রেশমি পোশাক, গায়ে মেখে নিলেন দামি সুগন্ধি। এবার একই ভোজসভায় তাকে অভ্যর্থনা জানানো হলো রাজকীয় মর্যাদায়, বসানো হলো ভোজসভার কেন্দ্রে। কিন্তু খাবার পরিবেশন করার পর শেখ সাদি নিজে না খেয়ে প্লেটের সুস্বাদু পোলাও, কাবাব ও কোরমা নিজের চোগা আর জামার পকেটে ভরতে লাগলেন।
বিস্মিত গৃহকর্তা জিজ্ঞেস করলেন, “জনাব, আপনি একি করছেন?” সাদি মুচকি হেসে জবাব দিলেন, “এই সুস্বাদু খাবারের যোগ্যতা আমার ব্যক্তিত্বের নয়, আমার এই জাঁকজমকপূর্ণ পোশাকের। গতকাল যখন মানুষ হিসেবে এসেছিলাম, তখন খাবার পাইনি; আজ পোশাক পরে এসেছি বলে এই খাতির। তাই খাবার তো পোশাকেরই প্রাপ্য।”
আজকের শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এই গল্পটির দিকে তাকালে কি মনে হয় জানেন? সময় পার হয়েছে শত শত বছর, কিন্তু মানুষের মনোজগৎ এক চুলও বদলায়নি। বাহ্যিকতার এই প্রদর্শন আর লোকদেখানো চকচকে মোড়কের বন্দিশালা থেকে সমাজ আজও মুক্ত হতে পারেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান তাঁর স্টাডি রুমে বসে ছিলেন। ঘরজুড়ে থরে থরে সাজানো বই। বাইরে হালকা বৃষ্টি হচ্ছে, আর ঘরের ভেতরে টিমটিম করে জ্বলছে একটা টেবিল ল্যাম্প। তাঁর মুখোমুখি বসে আছে তাঁর প্রিয় ছাত্র, বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম মেধাবী গবেষক ফাহিম।
ফাহিম গত কিছুদিন ধরে একটা তীব্র হতাশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তার সহপাঠীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের ছোটখাটো সাফল্যকেও বড় করে প্রচার করে বেড়াচ্ছে। কর্পোরেট বিশ্বে আর অ্যাকাডেমিক জগতে তারা বিশাল বিশাল নামও কুড়িয়েছে। অন্যদিকে ফাহিম গত দুই বছর ধরে নীরবে-নিভৃতে মৌলিক একটি সামাজিক বিষয়ে গবেষণার কাজ শেষ করেছে। তার কাজের মান অসাধারণ হলেও, সে নিজের ঢাক নিজে পেটাতে পারেনি। তাই তার গবেষণাটা মানবচক্ষুর আড়ালেই রয়ে গেছে।
ফাহিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “স্যার, শেখ সাদির পোশাকের গল্পটা কি আজকের যুগে আরও বেশি নির্মমভাবে সত্য নয়? আজও তো পোশাকে খাবার ভরানো হয়। এমনকি মানুষ নিজের ঢোল নিজেই পিটিয়ে আকাশ ফাটিয়ে ফেলছে। যে যত বেশি সোচ্চার, যে যত বেশি বাহ্যিকতার চাকচিক্য প্রদর্শনের সামনের সারিতে, সমাজ তাকে তত বেশি মাথায় তুলে নাচে। অথচ যারা প্রচারবিমুখ, যারা নিভৃতে কাজ করে, তাদের কি কোনো মূল্য আছে?”
ড. আনিসুর রহমান কফির কাপে চুমুক দিয়ে ফাহিমের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে প্রশান্তির ছায়া, কিন্তু কণ্ঠশ্বাসে কিছুটা বেদনার ছাপ।
“ফাহিম, তুমি যেটাকে বলছ আজকের যুগের সমস্যা, সেটা আসলে চিরন্তন এক হিউম্যান ট্রাজেডি। আবার এটাকে তুমি হিউম্যান সাইকোলজি বা মানব মনস্তত্ত্বও বলতে পারো,” আনিস সাহেব শান্ত গলায় বললেন। “মানুষ স্বভাবতই দৃষ্টিগ্রাহ্য বিষয় দিয়ে অন্যকে বিচার করতে পছন্দ করে। দৃশ্যমান চাকচিক্য মানুষকে দ্রুত আকর্ষণ করে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে, ভেতরের সত্যকে অনুধাবন করার জন্য যে ধৈর্য, যে অনুভূতি প্রয়োজন, তা অধিকাংশ মানুষের নেই।”
“তাহলে সত্যিকারের শ্রদ্ধার জায়গাটা কোথায়, স্যার?” ফাহিম প্রশ্ন করল। “যারা অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করে, তারা তো নীরবেই করে। হৃদয়ের সেই গভীর ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা কোনো দিন লাইক, কমেন্ট বা জনসমক্ষে আসে না। সমাজ তো তবে কেবল কোলাহলকেই সত্য বলে মেনে নিচ্ছে! নীরবতা কি তবে হেরে গেল?”
আনিস সাহেব একটু হাসলেন। তিনি টেবিলের ওপর রাখা একটা পুরোনো ডায়েরি খুললেন। “নীরবতা হেরে যায় না, ফাহিম। নীরবতা নিঃশব্দে মহীরুহ হয়ে টিকে থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সমাজ কেন এই সত্য শ্রদ্ধাকে গ্রহণ করতে পারে না? কারণ সমাজ বেঁচে থাকে গুঞ্জনে, জাঁকজমকে, কোলাহলে। মানুষ নিজের ঢাক নিজে পেটায়, কারণ সে জানে অন্য কেউ এসে তার ঢাক বাজাবে না। এই লোকদেখানো সংস্কৃতির পেছনে রয়েছে এক ধরনের হীনমন্য বোধ। রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা। আর এসব কিছু ঢাকতেই মানুষ বাইরের মোড়কটাকে এত চকচকে করতে চায়।”
ফাহিম ভ্রু কুঁচকে বলল, “কিন্তু স্যার, আমরা তো বরাবর জেনে এসেছি—ফলের চিন্তা না করে কর্ম করে যাও। বিভিন্ন দর্শনের মূল কথা তো এটাই যে, ফলের আশায় কাজ না করাই শ্রেয়। রিওয়ার্ড বা পুরস্কারের আশায় বসে না থাকাই তো উত্তম মানুষের লক্ষণ। পুরস্কারের অপেক্ষায় না থেকে নিজের সাধনায় নিমগ্ন থাকাই তো সত্যিকারের আচরণ। কিন্তু আজকের দিনে এই ‘উত্তম’ আদর্শের স্থান কোথায়?”
ড. আনিসুর রহমান জানালার দিকে তাকালেন। বাইরের বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কাঁচের গায়ে জমে জমে গড়িয়ে পড়ছে।
তিনি বললেন, “তুমি একদম ঠিক ধরেছ। নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাওয়া, ফলাফলের মোহ ত্যাগ করা—এগুলো মানব চরিত্রের সর্বোচ্চ স্তর। আমাদের সমাজ মুখে এই উত্তম আদর্শের জয়গান গায়। পাঠ্যপুস্তকে রচনা লেখে, বক্তৃতায় বড় বড় কথা বলে। কিন্তু বাস্তব জীবনে? সমাজ কি সত্যি সেই উত্তম মানুষকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে?”
“না, স্যার, করে না,” ফাহিম নিজেই উত্তর দিল। “সমাজ সেই মানুষটাকেই হাততালি দেয়, যে নিজের কাজের বিনিময়ে পুরস্কারটা ছিনিয়ে আনতে পারে, যে নিজের ব্র্যান্ডিং করতে জানে। আর যে মানুষটি নীরবে নিজের কাজ করে যায়, তাকে সমাজ মনে মনে হয়তো একটু শ্রদ্ধা করে, কিন্তু আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে না। তাকে ভাবা হয় বোকা, সরল অথবা অযৌক্তিক অনুভূতিপ্রবণ।”
“একদম তাই,” আনিস সাহেব সম্মতি জানালেন। “মানুষ মনে মনে ভালোটাকে স্বীকার করে ঠিকই, কিন্তু সেই স্বীকৃতি মনে মনেই রয়ে যায়। আর তুমি তো জানো, মনস্তত্ত্বের নিয়মে যে অনুভূতি বা উপলব্ধি মনের ভেতরেই বন্দি থাকে, তা প্রকাশ পায় না—সময়ের সাথে সাথে বুদবুদের মতো মিলিয়ে যায়। বাতাসের স্পর্শ যেমন একসময় শূন্যে মিলিয়ে যায়, মানুষের প্রচ্ছন্ন শ্রদ্ধাবোধও প্রকাশ না পেয়ে হাওয়ায় হারিয়ে যায়। দিনশেষে থেকে যায় কেবল সেই মিথ্যে ঢাকের আওয়াজ।”
ফাহিম নীরব হয়ে গেল। ঘরের পরিবেশটা বেশ ভারী হয়ে উঠেছে। কিছু সময় নীরবতার পর সে আবার শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “তাহলে এই মহাসমুদ্রে একজন মানুষের সত্যি করণীয় কী? লোকদেখানো কৃতজ্ঞতা আর সত্যিকারের আন্তরিক শ্রদ্ধার এই যুদ্ধে একজন সৎ মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকবে? কীভাবে সে সিদ্ধান্ত নেবে যে কোনটা ঠিক আর কোনটা ঠিক নয়?”
ড. আনিস রহমান তাঁর আসন ছেড়ে উঠলেন। ফাহিমের কাঁধে একটা হাত রেখে গভীর চোখে তাকালেন।
“বাস্তবতা হলো ফাহিম, কোনটা আসলে ঠিক, তা আমরা নিশ্চিত করে কেউ জানি না। কারণ সত্য আপেক্ষিক এবং সমাজ প্রতিনিয়ত তার মানদণ্ড পরিবর্তন করে। তবে হাজার বছরের দর্শন আমাদের একটা জিনিসই শেখায়—‘নিজের সঙ্গে নিজেই থাকা ভালো’। সেটাই পরম প্রাপ্তি।”
“নিজের সঙ্গে নিজে থাকা মানে?” ফাহিম জিজ্ঞেস করল।
“এর মানে হলো, তোমার সত্তাকে বাইরের কোলাহল, বাহ্যিক রূপ আর লোকদেখানো হাততালি থেকে মুক্ত রাখা,” আনিস সাহেব ব্যাখ্যা করলেন। “তুমি যখন কোনো কাজ করবে, তা করবে নিজের আত্মার তাগিদে, কোনো বাহ্যিক রিওয়ার্ড বা সামাজিক স্বীকৃতির আশায় নয়। যদি সমাজ তোমাকে চিনতে পারে, ভালো। যদি না পারে, তাতে তোমার কাজের বা তোমার সত্তার তিল পরিমাণ ক্ষয় হয় না। শেখ সাদি যখন তাঁর চোগায় খাবার ভরছিলেন, তিনি কিন্তু সমাজকে একটা আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি বুঝিয়েছিলেন, সমাজ যদি তোমার পোশাকের মূল্য দেয়, তবে সেই মূল্যকে উপহাস করাই বুদ্ধিমানের কাজ।”
আনিস সাহেব আরও বললেন, “আজকের যুগে কৃতজ্ঞতা আর শ্রদ্ধাও লোকদেখানোপনায় পর্যবসিত হয়েছে। মানুষ এখন শিক্ষককে বা গুরুকে শ্রদ্ধা জানাতেও ক্যামেরার ফ্রেম খোঁজে। ফেসবুকে দীর্ঘ পোস্ট লিখে শ্রদ্ধা জানানো যায়, অথচ তাঁর নিঃশ্বাসের শব্দ কেউ শুনতে পায় না। এই যে লোকদেখানো শ্রদ্ধা আর আন্তরিক শ্রদ্ধা—এর ফারাকটা খুব সূক্ষ্ম। আন্তরিক শ্রদ্ধার কোনো প্রদর্শনী হয় না, তা কারো প্রার্থিতও হওয়া উচিত নয়। সেটি প্রকাশ পায় কাজের মাধ্যমে, জীবন আচরণের মাধ্যমে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সমাজ প্রদর্শনীটাকেই আসল শ্রদ্ধা বলে ভুল করে।”
ফাহিম গভীর ভাবনায় ডুবে গেল। শিক্ষক যে কথাগুলো বলছেন, সেগুলো তার হৃদয়ে গিয়ে কাঁটার মতো বিঁধছে।
আনিস সাহেব আবার কফির কাপটা হাতে নিয়ে বললেন, “শোনো ফাহিম, একটা কথা চিরকাল মনে রাখবে। বুদবুদের মতো মিলিয়ে যাওয়া এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর হাততালি দিয়ে নিজের মূল্য নির্ধারণ করো না। ফলের আশা না করে কাজ করে যাওয়ার যে শিক্ষা, তা সমাজ গ্রহণ করুক বা না করুক, তোমাকে নিজের ভেতরে ধরে রাখতে হবে। মানুষ উত্তমকে আদর্শ না মানুক, তুমি যেন উত্তমের পথ থেকে বিচ্যুত না হও। কারণ দিনশেষে যখন তুমি একা আয়নার সামনে দাঁড়াবে, তখন তোমার ভেতরের মানুষটি যদি তোমাকে দেখে পরিতৃপ্ত হয়, সেটাই তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় রিওয়ার্ড। এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কিছু হতে পারে না।”
বৃষ্টির শব্দ কমে এসেছে। ঘরের ভেতর ল্যাম্পের আলোয় দুই প্রজন্মের দুই মানুষের মধ্যে এক গভীর সত্যের আদান-প্রদান ঘটে গেল।
ফাহিম উঠে দাঁড়াল। তার অন্তরের কোলাহল আর অনিশ্চয়তার মেঘ যেন কেটে গেছে। সে বুঝতে পেরেছে, নিজের ঢোল পিটিয়ে সাময়িক খ্যাতি পাওয়া যায় সত্য, পোশাকে খাবার ভরিয়ে সমাজকে ভুল বুঝিয়ে ভোজসভার সেরা আসনটাও পাওয়া যায়, কিন্তু আত্মার যে শান্তি, যে পরম প্রাপ্তি—তা লুকিয়ে থাকে নীরব সাধনায়। তা টিকে থাকে ফলাফলের চিন্তা না করার মধ্যে। মানুষ নিজের সঙ্গে নিজে কতখানি রয়েছে তার ভেতরে।
বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। ধুয়ে-মুছে যাওয়া রাতের আকাশ দেখা যাচ্ছে। ফাহিম মাথা নিচু করে শিক্ষকের চরণে হাত দিয়ে নিঃশব্দে প্রণাম করল। সেখানে না ছিল কোনো ক্যামেরা , আর না ছিল কোনো শব্দ। এমনকি সেখানে ছিল না কোনো সামাজিক মাধ্যমের কন্টেন্ট তৈরির তাগিদ। কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যে মিশে ছিল এমন এক শ্রদ্ধা, এমন এক স্থৈর্য, যা মোটেও বুদবুদের মতো মিলিয়ে যাওয়ার নয়। তা যেন মহাকালের ফলকে প্রকৃত সত্যের মতো খোদাই হয়ে রইল।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন