গজল, মরমী দর্শন ও আমাদের সাহিত্য

[ছবি : আমির খসরু ও নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) ১৬৬৪ সাল]


[আলাপ শুরুর আগে: নেপথ্যে বাজছেতেরে গম কো জান কি তালাশ থি : শওকত আলীর কণ্ঠে]

না সওয়াল-এ-ওয়াসল, না আর্জ-এ-গম, না হিকায়ত হ্যায় না শিকায়ত হ্যায়।

অর্থ: মিলনের কোনো প্রশ্ন নেই, দুঃখের কোনো আরজি নেই; কোনো গল্পও নেই, নেই কোনো অভিযোগও।

তেরে এহদ মে দিল-এ-জার কে সব একতিয়ার চলে গ্যয়ে।

অর্থ: তোমার প্রেমের সময়ে এই কাতর হৃদয়ের সব অধিকার হারিয়ে গেছে।


খোরশেদ আলম: (ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের লেখা একটি গজল বাজছে…) অসাধারণ! আমরা শুনছিলাম প্রখ্যাত শিল্পী শওকত আলীর কণ্ঠে এই গজল। গত কয়েকদিন ধরে আমি এই গজলের মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছি। আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি গজল এবং এর অন্তর্দশন নিয়ে আলাপ করতে। শুরুতেই ধন্যবাদ জানাই সুব্রত দত্তকে, যার পরিকল্পনা ও দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় আজকের এই আয়োজন। সেই সাথে আমাদের প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত আছেন মরমী গবেষক ও শিল্পী তসলিম হাসান।

সুব্রত, তোমার মাথায় এই গজলের ভাবনাটা কেন এলো? আলোচনার ভূমিকা হিসেবে যদি কিছু বলতে…

সুব্রত দত্ত: ধন্যবাদ স্যার। আসলে আমার ভাবনার জায়গাটা হলো—আমাদের দেশের সাহিত্যে গজলকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে? মানুষ এখন গজল কতটুকু শুনছে বা এর চর্চা কোথায়? আমাদের দেশে কাজী নজরুল ইসলাম বা অল্প কয়েকজন গজল নিয়ে কাজ করেছেন, কিন্তু সেটা খুবই সীমিত। বর্তমান সময়ের যাপিত জীবনে এই মরমীবাদের প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু? বিশেষ করে কোভিড পরবর্তী সময়ে সাহিত্যে যে পরিবর্তনের আভাস আমি পাচ্ছি, সেখানে কি গজলের বা মরমী সাহিত্যের কোনো বড় ভূমিকা থাকবে? এই জিজ্ঞাসাগুলো থেকেই আজকের আলোচনার প্রস্তাবনা।

খোরশেদ আলম: দারুণ বলেছ। তসলিম হাসান এই বিষয়টি নিয়ে অনেক দিন ধরে কাজ করছে আর নিজেও একজন গজল শিল্পী এবং গবেষক। আমি তো কেবল মুগ্ধ শ্রোতা, কিন্তু তসলিম হাসান এর গভীরে প্রবেশ করেছে। আমি তাকেই আলোচনার মূল সূত্রপাত করতে বলব। আমার প্রথম প্রশ্ন—এই গজল নামক শিল্পের উদ্ভব আসলে কোথায় এবং কীভাবে হয়েছিল?

তসলিম হাসান : ধন্যবাদ স্যার। দর্শকদের উদ্দেশ্যে গজলের উৎপত্তির ইতিহাসটা একটু পরিষ্কার করা দরকার। আমরা বর্তমানে গজলের যে কাঠামো দেখি, তার শেকড় প্রোথিত আরবের মরুভূমিতে। সেখানে সুফি-দরবেশ এবং কাফেলা নিয়ে পথ চলা মরুচারীদের হাত ধরেই এর জন্ম।

আরবিতে ‘কাসিদা’ নামে এক ধরনের দীর্ঘ কবিতা প্রচলিত ছিল। এই কাসিদাগুলো ছিল বেশ লম্বা এবং কখনও কখনও সাধারণ শ্রোতাদের কাছে তা ক্লান্তিকর মনে হতো। সেই কাসিদার ভেতরকার সবচেয়ে গীতল এবং বিরহী অংশটুকু ভেঙে পরবর্তীকালে গজলের জন্ম হয়। ঠিক যেমন ইতালীয় কবিতার সবচেয়ে সুরেলা অংশ নিয়ে সনেট তৈরির কথা বলা হয়, গজলের ক্ষেত্রেও অনেকটা তাই।

খোরশেদ আলম: তার মানে মরুচারী সেই বাউল বা পাগলরাই কি গজলের আদি রূপকার? তারা কোন দর্শনে প্রভাবিত হয়ে এটি শুরু করেছিলেন?

তসলিম হাসান : হ্যাঁ, এটা পাঠকদের বুঝতে হলে গজলের একদম মূল দর্শনে বা ‘বেসিক’ জায়গায় আমাদের যেতে হবে…

আসলে ‘গজল’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘গাজালা’ থেকে। গাজালা হলো মরুচারী ছোট্ট হরিণ। মরুভূমিতে এই হরিণকে নিয়ে এক অদ্ভুত মিথ আছে। বলা হয়, এই হরিণ নাকি যুবক পথিকদের প্রবঞ্চনা করে মরুর গভীরে নিয়ে যায়। সেই মায়ায় পড়ে যুবকেরা আর ফিরে আসে না; তারা দরবেশ, সুফি বা পাগল হয়ে যায়।

তবে গজলের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক রূপকটি হলো—মরুচারী এই হরিণ যখন ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ে, যখন বাঁচার জন্য কোনো রসদ নেই, ঘাস নেই, জল নেই—ঠিক মৃত্যুর আগের মুহূর্তে তার বুক চিরে যে হাহাকার বা আর্তিটি বের হয়ে আসে, সেটিই হলো গজল। জীবনানন্দের ব্যাঙ যেমন দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে, এই হরিণও বাঁচতে চায়, কিন্তু প্রকৃতি তাকে সেই সুযোগ দেয় না। এই যে একপেশে প্রেমের আকুতি, যেখানে প্রিয়তমা বা আরাধ্য কোনোদিন ধরা দিবে না—এই বিরহই গজলের প্রাণ।

খোরশেদ আলম: বাঘ এবং হরিণের একটি গল্পের কথাও তো প্রচলিত আছে, যা অনেকটা উপনিষদের দর্শনের মতো।

তসলিম হাসান: ঠিক তাই। বনের হরিণ বাঘের ভয়ে দৌড়াচ্ছে। দৌড়াতে দৌড়াতে যখন সে বুঝতে পারে আর পালানোর পথ নেই, তার এই হৃষ্টপুষ্ট যৌবনই আজ বাঘের খাদ্য হওয়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার আগে একটি শেষ চিৎকার দেয়। এই মরণ আর্তনাদই গজলের গীতল ও বেদনার্ত সত্তাকে ধারণ করে। গজল মানে তাই কেবল প্রেমিক-প্রেমিকার কথোপকথন নয়, এটি এক চরম সমর্পণ ও বিরহের নাম।

খোরশেদ আলম: খুবই চমৎকার! তোমার কথার মধ্যেই এসেছে যে গজলের আক্ষরিক অর্থ প্রেমিকার সাথে কথোপকথন। কিন্তু গজল তো অত্যন্ত দ্ব্যর্থক বা Ambiguous। আমি জানতে চাইছি, সব অঞ্চলের গজলে কি এই দ্ব্যর্থকতা বা গাঠনিক বৈশিষ্ট্য একই রকম? যেমন গজলের এই যে ‘শের’ বা ‘স্থায়ী-অন্তরা’র বিষয়টি, এটি যদি একটু পরিষ্কার করতে।

তসলিম হাসান: ওটাই বলছিলাম। ‘শের’ মানে কবিতা বা পদ। আগে শেরগুলো অনেক বড় হতো, এখন তা ছোট হয়ে দুলাইনে এসে ঠেকেছে। আরবি বা ফারসি গজলে একটি শেরের সাথে আরেকটি শেরের অর্থের মারাত্মক অন্বয় বা মিল থাকে। কিন্তু উর্দু গজলের ক্ষেত্রে সিস্টেমটা আলাদা। সেখানে প্রতিটি শের স্বয়ংসম্পূর্ণ। প্রথম শেরে হয়তো প্রেমের কথা, দ্বিতীয় শেরে শরাবখানা, আর তৃতীয় শেরে হয়তো স্রষ্টাকে নিয়ে কটাক্ষ! উর্দু গজলে যদি ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তবে তাকে ‘কমজোর’ মনে করা হয়।

খোরশেদ আলম: আমরা তো জানি গজলে রদিফ এবং কাফিয়া বলে দুটো কারিগরি দিক আছে। এগুলো কি সব ভাষায় সমান?

তসলিম হাসান: না, এখানেই পার্থক্য। আরবি গজলে ‘রদিফ’ (শব্দের পুনরাবৃত্তি) নেই, সেখানে কেবল ‘কাফিয়া’ বা অন্ত্যমিল থাকে। ১১শ শতকে ফারসি গজলে প্রথম রদিফ যুক্ত হয়। আর গজলের প্রথম শেরকে বলা হয় ‘মাতলা’ (যা অনেকটা স্থায়ী) এবং শেষ শেরকে বলা হয় ‘মাখতা’ (যেখানে কবির ভণিতা থাকে)।

ইতিহাসটা এমন—নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের পর কাসিদা ভেঙে গজলের জন্ম। ১১শ শতকে তা ফারসিতে আসে, আর ১৪শ শতকে আমির খসরুর হাত ধরে উর্দুতে গজল ও কাওয়ালির সূত্রপাত ঘটে।

সুব্রত দত্ত: আপনাদের এই সমৃদ্ধ আলোচনা থেকে আমরা গজলের কাঠামো ও ইতিহাস বুঝলাম। আমার জিজ্ঞাসা হলো—বাংলা সাহিত্যে গজলের অনুপ্রবেশ কীভাবে ঘটল? আমরা তো জানি নজরুল এটি এনেছেন, কিন্তু তার আগেও কি কোনো ইতিহাস ছিল?

তসলিম হাসান: সুব্রত, নজরুলের অনেক আগেই সুলতানি আমলে (১৪শ শতক) বাংলায় গজল বা ফারসি চর্চার বীজ বপন করা হয়েছিল। বিশেষ করে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ যখন ‘শাহ ই বাঙ্গালাহ্’ উপাধি নিয়ে বাংলা অঞ্চল শাসন করছেন, তখন থেকেই ফারসি গজলের প্রভাব শুরু হয়।

গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের কথা তো আমরা জানি, যিনি পারস্যের কবি হাফেজ সিরাজীকে বাংলায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। হাফেজ আসতে না পারলেও বাংলার সুলতানদের দরবারে ফারসি গজল ও সাহিত্যের এক বিশাল কদর ছিল। কাজেই নজরুলের হাত ধরে গজল পূর্ণতা পেলেও এর শেকড় কিন্তু অনেক গভীরে…

খোরশেদ আলম: তসলিম হাসান, তুমি সুলতানি আমলের যে ফারসি চর্চার কথা বললে, সেখানে একটি বিষয় কিন্তু খুব পরিষ্কার—দিল্লিতে যখন ফারসিতে গজল লেখা হচ্ছে, আমাদের এই বঙ্গদেশেও তখন ফারসি চর্চার একটা জোরালো চেষ্টা ছিল। কিন্তু দিল্লির আমির খসরু আর বাংলার চণ্ডীদাস কি একই সমান্তরালে ছিলেন?

তসলিম হাসান: স্যার, আপনি খুব চমৎকার একটি পয়েন্ট ধরেছেন। আসলে ফারসি তখন রাজদরবারের ভাষা হলেও তা কখনোই এ দেশের সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা হয়ে ওঠেনি। দিল্লিতে আমির খসরু যতই ফারসিতে গজল লিখুন না কেন, সেটা শেষ পর্যন্ত আমজনতার হৃদয়ে পৌঁছাতে পারেনি। কারণ সাধারণ মানুষ কথা বলত খাড়িবুলি বা দেহলভি উর্দুতে। আমির খসরু ভারতবাসীর কাছে ফারসি কবি হিসেবে যতটা না পরিচিত, তার চেয়ে অনেক বেশি সার্থক তিনি উর্দুর কাওয়াল বা লোকজ সুরের কারিগর হিসেবে।

বাংলাতেও ঠিক একই ব্যর্থতা ছিল। ফারসি এখানেও কেবল দরবারের ভাষা হিসেবেই রয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে, বাংলা অঞ্চলে তখন পদকর্তাদের জয়জয়কার। চণ্ডীদাস যেভাবে পঙক্তি বুনছেন, তা কিন্তু বিশ্বসাহিত্যের সম্পদ। চতুর্দশ শতকের সেই বৈষ্ণব পদাবলির যে উৎকর্ষ, তাকে কেবল আঞ্চলিক সাহিত্য বললে ভুল হবে। আমাদের পদকর্তারা ফারসি থেকে ঋণ করে কাব্যচর্চা করবেন—এতটা দৈন্যদশা তাঁদের ছিল না।

খোরশেদ আলম: একদম ঠিক। এমনকি আমরা যদি সেই সময়ের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার দিকে তাকাই, দেখব রাজারা কিন্তু সরাসরি বৈষ্ণব পদকর্তাদের চেয়ে কাশীরাম দাসদের মতো সংস্কৃত পণ্ডিতদের বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাঁদের বলা হতো, “জনসাধারণের ভাষায় অনুবাদ করো, আমরা অর্থ দেব।” অর্থাৎ, লোকভাষা তখন থেকেই নিজের জায়গা করে নেওয়ার লড়াই চালাচ্ছিল।

তসলিম হাসান: ঠিক তাই স্যার। আর দিল্লির প্রেক্ষাপটটা ছিল ভিন্ন। সেখানে আমির খসরুদের পূর্বপুরুষেরা এসেছিলেন মূলত রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে। খোয়ারেজমীয় সাম্রাজ্যের পতন আর চেঙ্গিস খাঁ বা তৈমুর লঙের ধ্বংসলীলার পর পারস্যের পণ্ডিত, শিল্পী ও কবিরা ভারতবর্ষে আশ্রয় নেন। তাঁরাই দেহলভি উর্দুকে উপজীব্য করে পারস্যের রক্ত আর ভারতীয় ভাষার মিশ্রণে নতুন সাহিত্য তৈরি করলেন।

কিন্তু বাংলার মাটি ও মানুষের শেকড় ছিল অনেক বেশি সংহত। এখানে পারস্যের রক্তের মানুষ এসে বাংলা সাহিত্যকে বিকশিত করেনি; বরং চণ্ডীদাস বা ময়মনসিংহে গীতিকার কবিরা এই মাটির রস থেকেই সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। তাই এখানে হুট করে ‘গজল’ তৈরি হওয়া ছিল বেশ কঠিন এক রাজনৈতিক ও ভাষাগত বিষয়। আমির খসরু যখন গজল লিখছিলেন, তিনি মূলত ফারসির কবি হতে চেয়েছিলেন, উর্দু নয়।

খোরশেদ আলম: এমনকি মির্জা গালিবের ক্ষেত্রেও আমরা একই জিনিস দেখি না? তিনি শুরুতে ফারসি নিয়েই অনেক বেশি উচ্চকিত ছিলেন, উর্দুকে খুব একটা আমল দিতে চাননি। অথচ ইতিহাস তাঁকে উর্দু কবি হিসেবেই অমর করল।

তসলিম হাসান: একদম ঠিক ধরেছেন স্যার! গালিবের মতো মহীরুহকেও শেষ পর্যন্ত সেই ‘জনমানুষের ভাষা’র কাছেই ফিরতে হয়েছে। আসলে উর্দু বা গজলকে তখন বলা হতো ‘রেকতা’। উর্দু নামটি তো অনেক পরে এসেছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র হওয়ার পর এটি যখন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পায়, তখন থেকেই এর আভিজাত্য বাড়ে। তার আগে এটি ছিল পথের ভাষা, গণমানুষের ভাষা।

সুব্রত দত্ত: তাহলে কি আমরা বলতে পারি যে গজল আসলে তার আভিজাত্য ভেঙে যখন গণমানুষের ভাষার সাথে মিশেছে, তখনই তা সার্থক হয়ে উঠেছে?

তসলিম হাসান: অবশ্যই সুব্রত। ভাষার রাজনীতি বা অঞ্চলের রাজনীতি যাই থাকুক না কেন, গজল তখনই স্থায়িত্ব পেয়েছে যখন তা মানুষের যাপিত জীবনের বিরহ আর মরমী হাহাকারকে নিজের করে নিতে পেরেছে। ফারসি বা রাজকীয় গজল রাজদরবারেই মরে গেছে, কিন্তু মানুষের মুখের ভাষায় রূপান্তরিত হওয়া ‘রেকতা’ বা আধুনিক গজল আজও বেঁচে আছে।

(১ম পর্বের সমাপ্তি)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন