স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার

শহিদ মিনারটি মুখ থুবড়ে পড়ে। যেন শত বছরের নিঃসঙ্গতা তাকে ঘিরে রেখেছে। সকরুণ সকালটি জানিয়ে গেল সাংঘাতিক এক বার্তা। একি শনির গ্রাস! একি রাহুর ষড়যন্ত্র! সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার তারা ভাই ভাই। ভাই ভাইয়ের গায়ে ঝুলে পড়ে আছে। কষ্টে তাদের বুকের ভেতরটা ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে বেরিয়ে পড়েছে। বুক উজাড় করে কলিজা, ফুসফুসগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে এবড়ো খেবড়ো। কংক্রিটের ভেতরের রডগুলো দেখা যাচ্ছে। যেন শিরা উপশিরাগুলো বেরিয়ে পড়েছে।  

— আঃ! আমাকে মেরো না। আমাদের আর আঘাত করো না। জাতি ক্ষমা করবে না। 

— তোমাদের মুখোশ আজ উন্মোচিত। 

— দুশমন তুমি। অরী ও বিদ্বেষী। চিনেছি তোমাদের। আর বিশ্বাস করতে বলো না। তবে আমরা কাউকে জানাবো না। 

— দয়া করে ক্ষান্ত করো। ক্ষান্ত করো এ নৃশংস আঘাত। আঃ, আমরা মরেও শান্তি পাইনি। এবার ছাড়ো। জাহান্নামে যাও…

এক সুতীব্র আকুতি কর্ণগোচর হয়। যেন বাঁচার নেশায় উন্মুখ। আর বেঁচেই তো আছে। শহিদের মৃত্যু নেই। তবু আজ মরণ কামড়ের অভাব নেই। মানুষগুলো পাশবিকতায় মেতে উঠেছে। তারা আজ মানুষ নয়, পশু। পশুরও বিশ্বাস আছে।  মানুষের নেই। 

ষড়যন্ত্র। হ্যাঁ, চক্রান্ত, গোপন ফন্দি, দুরভিসন্ধি। খড়্‌গ হানা বুক কোমর পীঠ। আর্তচিৎকারে আকাশ ভারী। সে ভারিত্ব নেমে আসে গভীর রাত অবধি। ঠান্ডা শীতল মেরুদণ্ড ভাঙা সে আঘাত। সপাৎ সপাৎ করে পড়ছে ঘাড়টার ওপরে। বাতাস গোঙায় – আমাদের তোমরা বাঁচতে দিলে না – মীরজাফর !!!

আত্মায় বিশ্বাস করে না সবাই। আত্মা তো নেই! তাই বিশ্বাসও নেই। শহিদেরা বাঁচে না। তাই সপাং সপাং আঘাতগুলো নির্মম হলেও, ভাঙনকারীদের অন্তরে বাজে না। 

মুখোশেরা নিশ্চিত, শহিদেরা তো বেঁচে নেই। এ শুধু মূর্তিময়ী এক প্রতীক। তারা তা-ই মানে: মূর্তি ময় তা বাস্তব নয়। তবুও বাস্তবতা তাকে ঘন করে তোলে। অবাস্তব। ঘন আবেগগুলো তাড়া খায় আত্মার ভেতরে। যদিও তাদের আবেগ নেই। তারা মনে করে, সবই তো মস্তিষ্কের খেলা। হৃদয় ঢিপঢিপ করে, তবুও আঘাত করে। তা মনের কুঠুরিতে বাজে না কোনোমতেই। তাদের তো আত্মা নেই, সেখানে বিশ্বাসও নেই। তাই কংক্রিট ভাঙার খেলায় কিছুই যায় আসে না।

মানুষ অমানুষ হয়। হিংসাগুলো তার পোড়া থাকে চামড়ার রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

সমাজের খেয়াল প্রতিষ্ঠিত করেছে তোমাদের। জেতায়নি তোমাদের বাঁকাচোরা মনমর্জিকে। কেনো তবে ভন্ডুলের নেশায় উদ্দীপিত হও? ভণ্ডামির সাতকাহন রচনা করেও হতে চাও সুমহান! কারণ তুমি যে কূটচালের হাতে নিজেকে করেছ সোপর্দ। আর ভেবেছ তোমাকে প্রমাণ করার কেউ নেই। তাই অবিশ্বাস করারও কেউ নেই। তাই তো করেছ নষ্টযজ্ঞ।

তুমি বা তোমরা তবে কী? নরকের কীট! পুতিগন্ধ বাহু মেলে বিস্তার করছ স্বকীয় সাম্রাজ্য! 

— এটা রাজনীতি। 

— মুখোশেরাই করিতেছে প্রতিরোধ।

— তাই !

— সত্য মিথ্যা এখানে একাকার। 

— হুম! ‘ইহা রাজ চক্র, ইহার মর্ম ভেদ করা বড়োই কঠিন।’

হায়! মনুষ্য নর্দমার কীট! দিনের মজুর বানালে প্রজাসকলকে। আর রাতের মজুর হলে নিজেরা কেউ কেউ। জানলো না সবাই। মজুরদের সঙ্গে নিলে না। যদি ধরা পড়ে। তাই যা কিছু করলে সব নিজেরাই। গোপন চক্রান্তে আর গুপ্ত পরিকল্পনায়। 

তোমার গোঁফ জোড়া চোমড়ানো হাসির নীল রেখা। তলে তলে উপযুক্ত প্রতিশোধ। তুমি দিনমজুরের কেউ নও। জমিদার জোতদারের বংশপরম্পরা। যদিও করো রাজনীতির ব্যাবসা, খাও কড়ি, ওরে ফেরিওয়ালা! খোট্টার বেশে নীরবে খাও বাট্টা। অন্ধকারে তোমার হাত নিজেরই বেহাত। তুমি তো ভানকারী এক ভণ্ড কাপুরুষ। 

কপট পরিকল্পনায় ষড়যন্ত্র চলল নিশুতি রাতে। প্যাঁচা চলে গেল অন্য বৃক্ষে। সবাই মিলে তারা প্রতিশোধ নেবে। অকারণ অবাঞ্ছিত এক প্রতিশোধ। দেবে মামলা, ভাঙবে শহিদ মিনার।  

জান কোরবান করা হুশ! যেন কাকপক্ষীও না জানতে পারে। পরদিন মিছিল হবে, স্লোগান হবে। মুখরিত হবে স্বদেশ। সে শুধু এক ভোরের প্রতীক্ষা। দেখো তারা কী করেছে! যেন বিক্ষত শরীর। মাংস বেরিয়ে আসছে। আহা কঙ্কালটাও!

সকলেই এক হও। দুনিয়ার সুচতুর !

পত্রিকায়, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সয়লাব হয়, বিবিসিতে সংবাদ হয়।

শুধু মিজু মিঞা জানতে পারে আসল সত্য। রাতের নিকষ অন্ধকারে কারা যেন সপাং সপাং শব্দ তোলে। সে কৌতূহলী — তাও নয়, চোখে পড়ে।  

নেতার বিবেক জাগে না। যেন শুধু রাজনীতি করে। পাকা আর পোক্ত রণনীতি। 

কুয়াশা ঘেরা সকাল। শহিদ মিনারের শহিদেরা অবিরল অশ্রুতে ভিজে যায়। চারিদিকে টকটকে লাল রক্ত গড়ায়! 

অন্তরীক্ষে ভাসে কণ্ঠ, বইছে শপথ সলিলধারায়—

সালাম বরকত রফিক জব্বার ওঠো, 

এই ভিজে সকালে প্রতিশ্রুতি নাও,

বের করে আনো অমোঘ সেই সত্য,

কারা তোমাদের করে রক্তাক্ত !

--খোরশেদ আলম, বাংলা বিভাগ, জাবি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন