
হাড়-পাঁজরা খোলা সেই রাতের গল্প
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির ওপরতলার রেস্টহাউসে সেই দিন… পশ্চিমবঙ্গের কবি রফিকুল ইসলামের স্মৃতির জানালা দিয়ে কিংবদন্তি সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে দেখার এক অপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়েছিল সেই আড্ডায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ জন শিক্ষক ও লেখকের উপস্থিতিতে এই আলাপচারিতাটি প্রাণবন্ত রূপ পেয়েছে। এই স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তাঁর স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায় (স্বাতী দি) এবং চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষের সঙ্গে কাটানো কিছু অমূল্য মুহূর্ত।
আড্ডায় অংশগ্রহণকারী : রফিকুল ইসলাম, শামীম রেজা, হামীম কামরুল হক, অবশেষ দাস ও খোরশেদ আলম।
আলাপ চলছে ধুন্ধুমার। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ঘরের আর বাইরের জীবন। দেবেশ রায়, ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, হুমায়ুন আহমেদসহ আরও অনেক লেখকের প্রসঙ্গ সেখানে ঘনিয়ে উঠল কথার সূত্র ধরে। তবে সেসব ছাড়িয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘হাড়-পাঁজরা খোলা সেই রাতের গল্প’ বড়োই আকর্ষণীয়। উঠে এলো বিয়ের ছবি ছাপানো প্রসঙ্গ…
শামীম রেজা: রফিক ভাই, সুনীলদাকে নিয়ে তো আপনার অনেক স্মৃতি। ওই যে মার্গারেটের ছবিটা আপনি ছাপলেন, ওটা নিয়ে তো বেশ গোলমাল হয়েছিল। ছবিটা কি পরে তুলে ফেলতে হয়েছিল?
রফিকুল ইসলাম: হ্যাঁ, ওটা তো শেষ পর্যন্ত তুলেই ফেলতে হলো।
হামীম কামরুল হক: ওই যে কপিটা আপনি ছেপেছিলেন, ওটা কি আপনার কাছে আছে এখনো?
রফিকুল ইসলাম: ছবিটা তো শেষ পর্যন্ত তুলতে হলো… আসলে ব্যাপারটা হয়েছিল কী, আমি রয়্যাল থেকে সেই ছবিগুলো নিয়ে সরাসরি বিজেশের কাছে চলে গেলাম।
খোরশেদ আলম: মানে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ি থেকে…
রফিকুল ইসলাম: ওই যে, রয়্যাল থেকে সেই ছবিগুলো নিয়ে আমি বিজেশকে দিয়ে এসেছিলাম… তার আগে এক গভীর রাতে—তখন প্রায় রাত একটা বাজে—আমি স্বাতীদির (স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়) কাছে গিয়ে হাজির। বললাম, “স্বাতীদি, আপনাদের বিয়ের ছবি চাই।”
শামীম রেজা : এসব ব্যক্তিগত ছবি…! উনি দিয়ে দিলেন?
রফিকুল ইসলাম: না, না, শোনো, স্বাতীদি তো অবাক! বললেন, “তুমি আমার বুকের পাঁজরায় হাত দিচ্ছ! বিয়ের অ্যালবাম থেকে ছবি আমি তোমাকে দিতে পারব না।” আমি নাছোড়বান্দা হয়ে বললাম, “আমি তো ফেরত দিয়ে দেব, আপনি ছবিগুলো বের করুন।” শেষে গজগজ করতে করতে তিনি অ্যালবাম বের করলেন। তাতে শৈশবের উলঙ্গ সুনীলদা থেকে শুরু করে তাঁর বাবার কোলের ছবি—সব ছিল। আমি তো সব ছবিই একপ্রকার দখল করলাম। এমনকি তাঁদের মালাবদলের ছবিটাও নিলাম।
খোরশেদ আলম: উনি কি সহজে ছাড়লেন ছবিগুলো?
রফিকুল ইসলাম: আরে না! আমি স্বাতীদিকে বললাম, “স্বাতীদি, আপনি তো সুনীতার চেয়েও সুন্দর। এই মালাবদলের ছবিতে আপনার মুখটা দেখুন একবার!” স্বাতীদি হেসে বললেন, “তুমি একটু বেশি খেয়ে ফেলেছ আজ।” আমি বললাম, “আমি কিন্তু আপনাকে মায়ের মতো ভালোবাসি সত্যি সত্যি।”
শেষমেশ তিনি এক প্যাকেট ছবি দিয়ে বললেন, “ফেরত দিও কিন্তু, তুমি আমার হাড়-পাঁজরা খুলে নিয়ে যাচ্ছ।” আমি সেই প্যাকেট নিয়ে সোজা বিজেশের কাছে চালান করে দিলাম।
অবশেষ দাস: সুনীলদার তো একটা সহজাত সারল্য ছিল। প্রথমবার দেখা হলে পায়ে ছুঁয়ে প্রণাম করতে গেলুম। এত্ত বড় লেখক! পরে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কি কি পড়েছ আমার? আমাকে ওঁর বিদেশের যাওয়ার সময়কার কোনো একটা ঘটনার কথা বলছিলেন আপনি…
রফিকুল ইসলাম: হ্যাঁ, সুনীলদা আর স্বাতীদি বিদেশে যাবেন, আমি এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিতে গেছি। ওঁর বাড়িতে গিয়ে দেখি এক ইনকাম ট্যাক্স অফিসার আর লয়ারের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বকবক করছেন। ট্যাক্সের টাকা কোথায় দেবেন—এই নিয়ে আলোচনা। আমি বসে আছি। ওগুলো মিটলে সুনীলদা আমাকে বললেন, “রফিক, দাঁড়াও, আমি একটু স্নান করি। দুজনে একসাথে খেয়ে তারপর বেরোব।”
স্নান করতে যাওয়ার সময় হঠাৎ ওঁর মনে পড়ল গৌতম ঘোষ আসার কথা। বললেন, “গৌতম আসবে চিত্রনাট্য নিতে। ‘মনের মানুষ’ ছবির চিত্রনাট্যটা আর দু-তিন পাতা লিখলে শেষ হয়ে যায়। ও এলে তুমি একটু কথা বলো, আমি কাজটা শেষ করি।”
শামীম রেজা: গৌতম ঘোষ যখন এলেন, তখন কি স্ক্রিপ্ট তৈরি?
রফিকুল ইসলাম: হ্যাঁ, গৌতমদা ঢুকেই জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি, ভালো আছো? স্ক্রিপ্টটা নেব।” সুনীলদা পাশের ঘরে গিয়ে বসলেন।
অবিশ্বাস্য ব্যাপার যে, ‘মনের মানুষ’-এর মতো অত বড় একটা ফিল্ম, তার স্ক্রিপ্ট মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে লিখে শেষ করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি।
অবশেষ দাস: কী যে অসাধারণ মানুষ ছিলেন…! সত্যি দাদা, আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষের সঙ্গে কী বিনয়ে তিনি যে কথা বলেছিলেন! আমাকে কত কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন…তাঁর মনটা সত্যি অনেক বড়ো…
হামীম কামরুল হক: বিজেশ চক্রবর্তী থেকে শুরু করে সেই সময়কার পত্রিকা—সুনীলকে ঘিরেই তো একটা জগৎ ছিল।
রফিকুল ইসলাম: একদম। আজও সেই ১৯ তারিখের কথা মনে পড়ে। ওঁর সেই কর্মব্যস্ততা, চিত্রনাট্য লেখা আর আমাদের সাথে আড্ডার সেই মুহূর্তগুলো—সবই আজ ইতিহাস। অত সাংঘাতিক একটা ফিল্মের চিত্রনাট্য তিনি নিমিষেই শেষ করে দিলেন! সেই সৃষ্টিশীলতা সামনাসামনি না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
খোরশেদ আলম: সত্যিই রফিক ভাই, আপনার এই স্মৃতিগুলো আমাদের জন্য এক বিশাল সম্পদ। তাঁকে মানুষ বইয়ের পাতায় পায়, কিন্তু আপনার কথায় চোখের সামনে ভেসে উঠল রক্ত-মাংসের একজন মানুষ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
রফিকুল ইসলাম ও অবশেষ দাস : পশ্চিমবঙ্গের লেখক ও কবি।
শামীম রেজা, হামীম কামরুল হক, খোরশেদ আলম : লেখক ও শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন