উপন্যাসের অন্দরমহল : আলাপ পর্ব-১

উপন্যাসের অন্দরমহল : আলাপ পর্ব-১

কথাসাহিত্যিকের সঙ্গে নিভৃত সংলাপ

মূলত উপন্যাস নিয়ে টুকরো কিছু কথাবার্তা হচ্ছিল কথাসাহিত্যিক হামীম কামরুল হকের সঙ্গে একান্ত ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়। এই সংলাপগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কেননা স্বতঃস্ফূর্ত এই আলাপে উঠে এসেছে—একটি উপন্যাসের জন্ম কীভাবে ও কোন প্রক্রিয়ায় হতে পারে। ব্যক্তিগত অনুভব থেকে শুরু হওয়া সেই আলাপ ক্রমান্বয়ে বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের দিকপাল কথাকারদের ছুঁয়ে বিস্তৃত হতে থাকল।

আলোচনা এমনভাবে জমে ওঠে যে, সেখানে নানা ঔপন্যাসিক ও উপন্যাসের দর্শনের পাশাপাশি উঠে আসে সাহিত্যের বিচিত্র তত্ত্ব—বিমূর্ততা, বাস্তবতা, আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতা; এবং সবশেষে মরমী জীবনবোধ। দেবেশ রায়, প্রফুল্ল রায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হক, হাসান আজিজুল হক প্রমুখ বাংলা কথাসাহিত্যিকদের প্রসঙ্গে আলোচনা চলতে থাকল। পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্যের লাসলো ক্রাসনোহোরকাই, এলিস মুনরো, হোর্হে লুই বোর্হেস, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, রবার্ট মুসিল, হারম্যান ব্রচ, হেনরি মিলার, জেমস জয়েস, ডি. এইচ. লরেন্সসহ বহুজনকে স্পর্শ করে আলাপ শেষ পর্যন্ত থিতু হলো দস্তয়েভস্কি প্রসঙ্গে।

তবে আমাদের এই আলাপচারিতা যেন ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। হয়তো এই সংলাপ চলবে ঘরে-বাইরে, যখনই দেখা হবে; চলতে থাকবে ততদিন—যতদিন না আমরা নিজেরা ক্লান্ত হয়ে যাই।

সূত্রধর/প্রশ্নকর্তা : খোরশেদ আলম 

কথক/উত্তরদাতা : হামীম কামরুল হক


আলাপ পর্ব-১: শিকড়, ইতিহাস ও উপন্যাসের বিস্তার

হামীম কামরুল হক: একটা নদী—বারাসিয়া নদী। এখন তো শুকিয়ে কাঠ। অথচ এই নদীটাই মধুমতীর একটা অংশ। এই নদীর যদি একটা কাল্পনিক ইতিহাস দাঁড় করানো যায়, এলাকাটাকে একটা কাল্পনিক নাম দেওয়া যায়—তবেই তো উপন্যাসের শুরু। তোমার হাতে তো অনেকগুলো শক্তি আছে। তুমি আঞ্চলিক ভাষা জানো, ওখানকার জনপদকে চেনো। রংপুরের যে কিংবদন্তি আর ইতিহাস, সেটাকে নিবিড়ভাবে পড়ো। তোমার চেনা বাজার, পুরনো মসজিদ বা মন্দির—এগুলো কেন্দ্র করেই অনায়াসে একশ পৃষ্ঠা লেখা যায়। তুচ্ছ অভিজ্ঞতাই মহৎ সাহিত্যের কাঁচামাল।

খোরশেদ আলম: মানে আপনি বলছেন স্মৃতির ডিটেইলিং থেকে ঐতিহাসিক পটভূমি তৈরি করা?

হামীম কামরুল হক: ঠিক তাই। যেমন ধরো সৃজিতের ‘রাজকাহিনী’ সিনেমাটার কথা। মাঝখান দিয়ে বর্ডার যাচ্ছে, একপাশে ভারত অন্যপাশে পাকিস্তান। মাঝখানে পড়ে গেল একটা গণিকালয়। রংপুরের এক নবাবের ট্র্যাজেডিও সেখানে আছে। রংপুর-বগুড়ার তো প্রাচীন ঐতিহ্য। তোমার পরিবারের কোনো একটা ‘সিট’ বা খ্যাপাটে চরিত্রকে বেছে নাও। উপন্যাসের জন্য এই ঐতিহাসিক আর পারিবারিক প্রেক্ষাপটগুলো খুব জরুরি। তবে উপন্যাসের গঠন তো সহজ নয়, এটি অধ্যায়ের পর অধ্যায় জুড়ে এক জটিল বিন্যাস।

খোরশেদ আলম: এই জটিলতার কথা বলতে গিয়ে বিশ্বসাহিত্যের কাদের কথা মনে পড়ে আপনার?

হামীম কামরুল হক: অস্ট্রিয়ান দুই ঔপন্যাসিকের কথা বলতে পারি— রবার্ট মুসিল আর হারম্যান ব্রচ। মুসিলের ‘দ্য ম্যান উইদাউট কোয়ালিটিস’ আর ব্রচের ‘দ্য স্লিপওয়াকার্স’। এগুলো আধুনিক উপন্যাসের স্তম্ভ। আমি মুসিলের বইটা পেয়েছিলাম শামীম রেজার কাছে। এঁরা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এমন ডিটেইল বর্ণনা দেন যে তুমি শিহরিত হবে। যেমন ধরা যাক, এক হাড়কাঁপানো শীতের বর্ণনা—উত্তরের হাওয়া বইছে মাইনাস সাত ডিগ্রিতে, সেই হাওয়ারও একটা চরিত্র আছে। ইউরোপীয় সাহিত্যে শব্দের কারুকাজ অনেক, অথচ বাঙালির ভেতরে যেন কোনো শব্দ নেই। সে ভেতরে নীরব, বাইরে সশব্দ।

খোরশেদ আলম: আমাদের এখানকার লেখকদের মধ্যে এই ডিটেইলিং কার কাজে বেশি পাওয়া যায়?

হামীম কামরুল হক: তুমি যদি খুঁটিনাটি বর্ণনায় যেতে চাও, তবে দেবেশ রায়-এর উপন্যাস দেখো। তাঁর মতো লিখতে গেলে তোমাকে লিখে শেষ করতে হবে না। তোমার এলাকার নদীটার নাম যেন কী বললে?

খোরশেদ আলম: আমাদের বাড়ির নদী হলো ‘মানস নদী’। আর জেলা সদরে আছে ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ইত্যাদি।

হামীম কামরুল হক: এই যে মানস নদী! একে কেন্দ্র করে ওখানকার কৃষক, উৎপাদন ব্যবস্থা আর মানুষের জীবন নিয়ে তুমি তোমার মতো করে লেখো। এমন উপন্যাস তো অনেক লেখা হয়েছে, কিন্তু ‘তোমারটা’ তো কেউ লেখেনি। আমাদের সমস্যা হলো আমরা ভাবি একই বিষয় নিয়ে কত লেখা হবে! অথচ দেখো, মুসিল আর ব্রচ প্রায় একই ঘরানায় লিখেও দুজনেই মাস্টারপিস তৈরি করে গেছেন।

খোরশেদ আলম: তার মানে মৌলিকত্ব বিষয়ের চেয়ে দেখার ভঙ্গিতে বেশি?

হামীম কামরুল হক: অবশ্যই। আজ ক্লাসের একটা অভিজ্ঞতা বলি। অরিত্র নামে ইংরেজি বিভাগের এক ছাত্রকে মার্কেসের একটা উপন্যাসের নাম বলতে বলায় সে চট করে বলে দিল। পরে দেখি ছেলেটা নিজেই কয়েকটা বই লিখে ফেলেছে। অথচ সে বিনয়ের সঙ্গে বলছে—’স্যার, আমার তো হয় না’। এই যে অতৃপ্তি, এটাই লেখকের শক্তি। যত পড়বে, যত দেখবে—তত মনে হবে উপন্যাস আসলে এক অন্তহীন যাত্রা।

খোরশেদ আলম: [পূর্বস্মৃতি ও ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের রেশ ধরে] আপনি নদী আর আঞ্চলিকতার কথা বলছিলেন, সেখান থেকে তো বড় কাহিনি লেখা সম্ভব। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে একটা সমস্যা হয়েছে— বোর্হেস আমাকে পেয়ে বসেছেন। বোর্হেসের লেখা পড়ে আমি রীতিমতো মুগ্ধ। বোর্হেস যে বলেছিলেন উপন্যাস হওয়ার কিছু নেই, এটা স্রেফ একটা লম্বা কাহিনি—এই মতটা আমার ভেতরে কাজ করছে।

হামীম কামরুল হক: বোর্হেস সম্পর্কে এক বিখ্যাতজন বলেছিলেন, তাঁর কোনো ‘বডি’ বা শরীর নেই; তাঁর পুরোটাই হচ্ছে মাথা—একটি স্মার্ট মাথা। রাজু ভাই (ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্য নিয়ে তাঁর বইতে) বিস্তারিত প্রমাণসহ লিখেছেন যে বোর্হেস তো আসলে শারীরিকভাবে এক প্রকার অক্ষম বা নপুংসক ছিলেন। এই শরীরহীনতা বা ইন্দ্রিয়বিমুখতাই কি তাঁকে ‘অ্যান্টি-উপন্যাস’ থিওরির দিকে ঠেলে দিয়েছিল? তিনি মূলত গল্পের মানুষ। আর গল্পের মানুষেরা অনেক সময় উপন্যাসের বিশাল ক্যানভাসটাকে ধরতে চান না, বা ধরার সময় পান না। যেমন এলিস মুনরো, দুর্দান্ত গল্পকার; তিনিও কিন্তু উপন্যাসের জায়গাটা ধরতে পারেন না।

আসলে উপন্যাসের ওপর একটা ‘আস্থা’ রাখতে হয়। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস উপন্যাসে আস্থা রাখতেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ঢাউস ঢাউস বই লিখে গেছেন ঠিকই, কিন্তু উপন্যাসের চেয়ে তাঁর ঝোঁক ছিল কাহিনির দিকে। তাঁর লেখা পড়তে ভালো লাগে, কিন্তু সেগুলো অনেকটা লম্বা কাহিনির মতো।

খোরশেদ আলম: তাহলে আপনার দৃষ্টিতে এই সময়ে সার্থকভাবে কাহিনি ও উপন্যাসের স্পিরিট মেলাতে পেরেছেন কে?

হামীম কামরুল হক: আমার এখন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কথা মনে হয়। শীর্ষেন্দু কাহিনি বলতে জানেন, সেনসেশন তৈরি করতে পারেন। তিনি অনুকূল ঠাকুরের ভক্ত হতে পারেন, কিন্তু তাঁর লেখায় মানুষের যে দগদগে হিংস্র ছবি উঠে আসে, তা অসামান্য। ধরো ‘মানবজমিন’-এর সেই ছেলেটার কথা। সে জানে তার মা তার জ্যাঠার (ভাসুর) সাথে সম্পর্ক করে সম্পত্তি লিখিয়ে নিয়েছে। কিন্তু ছেলেটা ডার্কনেস থেকে নয়, বরং এক সহজাত কিশোর বোধ থেকে মনে করে—তার জ্যাঠাই যেন তার আসল বাবা হয়! কারণ তার নিজের বাবা লোকটা ভালো নয়। কী নিদারুণ এক উপলব্ধি!

খোরশেদ আলম: এটা কি উপন্যাসের জটিল মনস্তত্ত্বের কারণে হয়?

হামীম কামরুল হক: অবশ্যই। আমি একবার সৌদাপাকে (ড. সৌদা আখতার, জাবির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক) বলেছিলাম—অমিয়ভূষণ পড়ার চেয়ে ইংরেজি উপন্যাস পড়া সহজ। অমিয়ভূষণের ভেতরে যে জটিল বয়ন আছে, সেটা ধরা মুশকিল। যেমনটা আগে তারাশঙ্করের ‘হাসুলীবাঁকের উপকথা’ নিয়ে বলছিলাম। জনৈক আলোচক একবার ওই উপন্যাসের সব খুঁটিনাটি আলোচনা করে শেষে বললেন—সবই আছে, শুধু ‘উপন্যাস’টা নেই। তারাশঙ্কর তো শুনে বিধ্বস্ত, কান্নাকাটি দশা! দেবেশ রায় এই গল্পটা বলতেন। আসলে উপন্যাস কিসে হয়, আর কিসে হয় না—তা বলা খুব কঠিন। জন স্টেইনবেকের বিশাল ‘ইস্ট অফ ইডেন’ যা পারেনি, তাঁর ছোট্ট ‘অফ মাইস অ্যান্ড মেন’ তা করে দেখিয়েছে।

খোরশেদ আলম: আপনি কি তবে ডিটেইলিং আর ব্যাপ্তির চেয়ে উপন্যাসের ‘মায়া’ বা প্রাণশক্তির ওপর জোর দিচ্ছেন?

হামীম কামরুল হক: কিছুটা তাই। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ আমি এক বছর ধরে পড়েছি। এর ভেতর এক অদ্ভুত মায়াবী ব্যাপার আছে। আমি দেবেশ দাকে (দেবেশ রায়) একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম অতীনের এই উপন্যাস নিয়ে। দেবেশ দা বলেছিলেন, তিনি অতীনকে বলেছিলেন—‘তুই এত ভালো একটা লেখা লিখলি (নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে), এরপরে আবার পরের খণ্ডগুলো লিখতে গেলি কেন?’ অতীন উত্তর দিয়েছিলেন—‘প্রকাশক বলল টাকা দেবে, চলতে তো হবে!’

আসলে ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’-র পর ‘মানুষের ঘরবাড়ি’, ‘ঈশ্বরের বাগান’ আর শেষে ‘অলৌকিক জলযান’—এই যে বিশাল ব্যাপ্তি, এটা অতীনের বিচিত্র জীবন অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে। তিনি খালাসি হয়ে পৃথিবীর নানা জায়গায় ঘুরেছেন। বাংলা সাহিত্যের আর কোনো ঔপন্যাসিকের এমন বৈচিত্র্যময় জীবন নেই। তিনি এ বঙ্গের লোক ছিলেন না, ওপার থেকে চলে এসেছিলেন—সেই উদ্বাস্তু জীবনের দহন আর বিশ্বভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁকে এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছে।

১ম পর্বের সমাপ্তি: উপন্যাস নিছক কোনো কাহিনি নয়, বরং যাপিত জীবনের এক জটিল ও বিমূর্ত দর্শন। কথাসাহিত্যিক হামীম কামরুল হকের সঙ্গে আলাপচারিতায় একে একে উঠে আসছিল গুপ্তধনের মতো রত্নপাথর—সেই সৃজন-রহস্য। বারাসিয়া নদীর শুকনো পাড় থেকে আলোচনা ডালপালা মেলল বিশ্বসাহিত্যের গহীন অরণ্যে। এই সংলাপ যেন শেষ হয়েও শেষ হয় না। দেবেশ রায় থেকে মার্কেজ, ইলিয়াস থেকে দস্তয়েভস্কি—এই আলাপ চলতে থাকবে। হয়তো কোনো কফিশপে বা নির্জন কোনো নদীর ধারে। কারণ, উপন্যাস মানেই তো জীবনের সেই অসমাপ্ত অংশ, যা লিখেও শেষ করা যায় না…

হামীম কামরুল হক, কথাসাহিত্যিক; শিক্ষক, তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

খোরশেদ আলম, লেখক; শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন