উপন্যাসের অন্দরমহল: আলাপ (পর্ব-২)

উপন্যাসের গহন পথ : ব্যক্তি ও সৃজন

উপন্যাসের গহন পথ : ব্যক্তি ও সৃজন

আলাপচারিতার এই পর্যায়ে কথাসাহিত্যিক হামীম কামরুল হকের জবানিতে দেবেশ রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং প্রফুল্ল রায়ের লেখক-সত্তা নিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও কিছুটা তাত্ত্বিক বিতর্কের জায়গা তৈরি হয়েছে। এছাড়াও প্রাসঙ্গিকভাবে এসেছে ইলিয়াস, মাহমুদুল হক, রুশদি, নাইপল ও দস্তয়েভস্কির কথা।  

১ম পর্বের লিঙ্ক : https://wp.me/p46zKa-2n2


উপন্যাসের অন্দরমহল: আলাপচারিতা (পর্ব-২)

সূত্রধর: খোরশেদ আলম

কথক: হামীম কামরুল হক


হামীম কামরুল হক: ওই যে বললাম না, আসলে এই যে বিশাল ব্যাপ্তি, এটা অতীনের বিচিত্র জীবন অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে। তিনি খালাসি হয়ে পৃথিবীর নানা জায়গায় ঘুরেছেন। বাংলা সাহিত্যের আর কোনো ঔপন্যাসিকের এমন বৈচিত্র্যময় জীবন নেই। এদিকটা দেখো, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় আর প্রফুল্ল রায়— দুজনেই আসলে একই ধাতুর মানুষ। প্রফুল্ল রায়ও অতীনের মতো বিশাল বিশাল সব কাজ করেছেন। যেমন ‘কেয়াপাতার নৌকো’র ওই চার খণ্ড কিংবা ‘সত্তা ধারায় বয়ে যায়’। আমি যেটা মনে করি, উপন্যাসের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার চরিত্র। আমরা যখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সাহিত্য পড়ি, তখন দেখি ‘দন কিহোতে’ হচ্ছে একটি সার্থক চরিত্র-ভিত্তিক উপন্যাস। সেখানে কাহিনি বড় কথা নয়, বড় কথা হলো ওই চরিত্র দুটির ভ্রমণ আর যাত্রা।

খোরশেদ আলম: এখানে একটা প্রশ্ন জাগে—উপন্যাসে কি চরিত্ররা নিজেরা কথা বলবে, নাকি লেখক চরিত্রগুলোকে ডিল করবেন বা তাঁদের হয়ে কথা বলবেন?

হামীম কামরুল হক: ঘটনাটা ঘটাবে চরিত্ররাই, লেখক শুধু তাঁদের অনুসরণ (ফলো) করবেন। ধরো, তোমার স্কুলের কোনো বিচিত্র বন্ধুর কথা ভাবো। সেই বন্ধুর হয়ত একটা অদ্ভুত বোন আছে, বা বোনটা জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী। এই চরিত্রগুলোকে কেন্দ্র করেই একসঙ্গে দুই-তিনটা কাহিনি বা ‘সাব-প্লট’ চলতে পারে। আমরা যত কাহিনিই বানাই না কেন, আমাদের দেখার বাইরের জগত থেকে তা খুব একটা দূরে যায় না।

খোরশেদ আলম: কিন্তু উপন্যাসের তো একটা নিজস্ব কাঠামো বা কনস্ট্রাকশন আছে। যেমন ধরুন, সালমান রুশদি পড়তে গিয়ে আমি খেই হারিয়ে ফেলি। তাঁর ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’ পড়ার সময় মনে হয়—কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছেন, ঠাহর করতে পারা ভিরমি খাওয়ার মতো।

হামীম কামরুল হক: সালমান রুশদির ওই লেখাটা আমার কাছেও খুব বেশি আমুদে মনে হয়নি। ওটা আসলে গল্পের আমোদ নয়, বরং একটা ‘প্রজেক্ট’ মনে হয়েছে। দস্তয়েভস্কির উপন্যাসের ভেতরে যে এক প্রকার ধকধকে প্রাণ আছে, রুশদির লেখায় আমি সেই প্রাণটা পাই না। তাঁর লেখা সুন্দর, শব্দচয়ন চমৎকার, কিন্তু ওই ধকধকে প্রাণের অভাব আছে। এই প্রসঙ্গে দেবেশ রায় একবার নাইপল আর সালমান রুশদির কথা বলেছিলেন।

খোরশেদ আলম: ‘কোন লেখাগুলো আসলে সুন্দর? গদ্য? 

হামীম কামরুল হক: না, শুধু গদ্য নয়, সামগ্রিকভাবে তাঁর গদ্যশৈলী ও বয়ন সুন্দর। এই একই কথা নাইপল আর সালমান রুশদি সম্পর্কে দেবেশ রায়ও বলেছিলেন।

খোরশেদ আলম: দেবেশ রায় প্রসঙ্গে হিরন্ময় দার কি একটা ভিন্ন আলাপ আছে না? একবার বলছিলেন, তিনি (হিরন্ময়) বলতে চান, দেবেশ রায় তাঁর প্রজেক্ট বা লেখাগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিজের কাজ বা প্রতিষ্ঠানকে বেশ কৌশলে ব্যবহার করেছেন।

হামীম কামরুল হক: হ্যাঁ, দেবেশ রায় এ ব্যাপারে বেশ সচেতন ছিলেন। তিনি রাজবংশীদের কাহিনি বাংলা ভাষায় লিখেছেন—এটা তাঁর একটা বড় কাজ। তবে তিনি যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট বা ‘প্রতিক্ষণ’-এর মতো প্রকাশনীকে নিজের লেখক-সত্তা বা সাহিত্য প্রচারের কাজে লাগিয়েছেন, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। দেবেশ রায় একবার শামীম রেজাকে একটা বুদ্ধি দিয়েছিলেন— লেখক হতে হলে পরের ঘাড়ে খেতেই হবে, এই লজ্জাটা নিতেই হবে। সেটা হতে পারে স্ত্রীর ঘাড়ে, ভাইয়ের ঘাড়ে বা কোনো জমিদারের ঘাড়ে। নিজে আয়-উপার্জন করে বড়ো লেখক হওয়ার নজির পৃথিবীতে খুব একটা নেই। দেবেশ রায় নিজে অধ্যাপক ছিলেন, প্রচণ্ড শিক্ষিত মানুষ ছিলেন, কিন্তু তাঁর নিজস্ব ‘এক্সপ্লোরেশন’-এর জন্য তিনি সব পথ পরিষ্কার রাখতেন।

খোরশেদ আলম: তিনি কি তবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তাকে ঈর্ষা করতেন বা খাটো করে দেখতেন?

হামীম কামরুল হক: দেবেশ রায়ের একটা বক্তব্য ছিল— সুনীল আসলে কে? বাংলা ভাষার (বা দুই বাংলার) প্রধান কবি, নাকি প্রধান কথাশিল্পী, নাকি নাট্যকার? তাঁর মতে, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে একটি সুনির্দিষ্ট আইডেন্টিটি আছে, সুনীলের তা নেই। সুনীল তো দুই হাতে লিখে গেছেন—কখনো প্রেমের উপন্যাস, কখনো ঢাউস কাহিনি। কিন্তু প্রফুল্ল রায়ের মতো মানুষেরা লেখক হিসেবেই জীবনযাপন করেছেন।

খোরশেদ আলম: প্রফুল্ল রায়ের জনপ্রিয়তা বা তাঁর গ্রহণযোগ্যতার বিশেষ কারণ কী বলে আপনার মনে হয়?

হামীম কামরুল হক: প্রফুল্ল রায়ের কতগুলো লেখা নিয়ে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত সিনেমা করেছেন! সারা ভারতের যেকোনো বাংলা সংকলনে প্রফুল্ল রায়ের নাম থাকবেই। এর প্রধান কারণ হলো তাঁর লেখার ‘ইন্ডিয়াননেস’ বা ভারতীয়ত্ব। খুব ছোট লেখাতেও তিনি এই ভারতীয় বোধটাকে অদ্ভুতভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন।

খোরশেদ আলম: লেখকদের বোধ হয় একটা জাতীয় ভূমি বা দেশ লাগে? কী বলেন?

হামীম কামরুল হক: সেটাই, দেখো, প্রফুল্ল রায়ের ওই ‘ভারতীয়ত্ব’ বা মাটির টান তাঁকে সর্বজনীন করেছে। তবে জনপ্রিয় হওয়া আর গভীর হওয়া তো এক কথা নয়। আমরা যখন উপন্যাসের শিল্পশৈলী নিয়ে কথা বলি, তখন দস্তয়েভস্কির সেই মরমী অন্ধকার কিংবা মার্কেজের জাদুবাস্তবতা আমাদের সামনে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে দাঁড়ায়।

খোরশেদ আলম: ঠিক এই জায়গাটাতেই কি তাহলে বাংলা উপন্যাস কিছুটা থমকে আছে? নাকি আমাদের মাহমুদুল হক বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সেই দেয়াল ভাঙতে পেরেছিলেন?

হামীম কামরুল হক: (একটু রহস্যময় হাসি হেসে) ইলিয়াস বা মাহমুদুল হক তো বাংলা উপন্যাসের এমন কিছু বাঁক তৈরি করেছেন যা বিশ্বসাহিত্যের যে কোনো ধ্রুপদী কাজের সমতুল্য। বিশেষ করে মাহমুদুল হকের গদ্যের যে বিমূর্ততা আর ইলিয়াসের সেই হাড্ডি খোর ঘোর বাস্তবতা—সেটা না বুঝলে উপন্যাসের আসল রস আস্বাদন করা অসম্ভব। আচ্ছা, লাসলো ক্রাসনোহোরকাই-এর প্রসঙ্গে এবার তো লিখেছি, তা তো জানো? কিংবা ধরো, বোর্হেস কিংবা এলিস মুনরোর কথা আগেই আলাপ করেছি, দুর্দান্ত গল্পকার; কিন্তু উপন্যাসের জায়গাটা ধরতে পারেন না।

খোরশেদ আলম: আর দস্তয়েভস্কি? যাঁর কথা আপনি বারবার বলেন…

হামীম কামরুল হক: দস্তয়েভস্কি তো কেবল লেখক নন, তিনি এক অতলান্তিক গোলকধাঁধা। সেই গোলকধাঁধায় ঢোকার আগে আমাদের একটু জিরিয়ে নিতে হবে। আগামীবার যখন বসবো, তখন এই বিশ্বসাহিত্যের মহান কারিগরদের অন্দরমহল নিয়ে না হয় আরও গভীরে যাওয়া যাবে। 

খোরশেদ আলম: অবশ্যই। 

…পরের পর্বের জন্য তোলা থাকল সেই আলাপ।


হামীম কামরুল হক, কথাসাহিত্যিক; শিক্ষক, তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

খোরশেদ আলম, লেখক; শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন